আশ্বাস দিয়েও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই : চারুশিল্পী মানবেন্দ্র
বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:৪৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
চারুশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, “গত বছর এই দিনে আমার ঘর পুড়ে যায়। সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল, তবে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।”
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার গড়পাড়া ঘোষের বাড়ি এলাকায় পুড়ে যাওয়া নিজের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। গত বছরের পহেলা বৈশাখে বাঘের মোটিফ তৈরি করা এই শিল্পী এখনও সেই ক্ষতির ভার বইছেন।
তিনি বলেন, “প্রশাসন আমাকে কখনো না করেনি—এটা ঠিক, কিন্তু আমি আশাহত। আমার জন্য তারা কতটুকু করেছে আর কতটুকু করেনি, তা স্পষ্ট। ঘটনার এক-দুই দিনের মধ্যে তৎকালীন জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাকে একটি টোকেন অর্থ সহায়তা দেন। এরপর আজ পর্যন্ত কোনো আর্থিক সহায়তা বা অন্য কিছু পাইনি।”
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যোগাযোগ করেন। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসন নিয়মিত খোঁজখবর নিয়েছে এবং পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছে। তবে তখন যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল—‘দাদা, আপনার জন্য আমরা সবকিছু করব’ সেটার কোনো বাস্তব অগ্রগতি বা লিখিত প্রমাণ আমি পাইনি।”
মানবেন্দ্র ঘোষ বলেন, “ঘটনার পরপরই তৎকালীন ডিসি আমার বাড়ির উঠানে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে দ্রুত স্টুডিও পুনর্নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু আমরা তো কিছু চাইনি, তারা নিজেরাই বলেছেন। এখন সেই আশ্বাস শুধু কথার মধ্যেই রয়ে গেছে।”
তিনি জানান, মাঝে মাঝে তিনি সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। “তখন তারা বলেছেন কাজ চলছে, কিন্তু কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। এর মধ্যেই ডিসির পরিবর্তন হয়েছে। পরে নতুন ডিসির সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারাও ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন, কিন্তু অনেক সময় পার হয়ে গেছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, “একটি বছর ধরে আমি প্রায় কাজের বাইরে। আমি কোনো চাকরি করি না, শিল্পকর্মই আমার জীবিকা। আশা ছিল, স্টুডিও পুনর্নির্মাণ হলে আবার কাজ শুরু করতে পারব।”
তিনি আরও বলেন, “কী আর করা! হয় ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করি, নয়তো আবার চেষ্টা করি। কিছুদিন আগে সদর উপজেলার ইউএনও আমাকে বলেছিলেন, ‘আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে ১০টি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়ে অনুদান নিতেন।’ কিন্তু আমি অনুদানের ওপর নির্ভর করে জীবন কাটাতে চাই না। আমাদের নিজেদের চলার মতো সামর্থ্য আছে। দীর্ঘ সময় পর ডিসি অফিসে যোগাযোগ করলে জানানো হয়েছে, এলজিআরডির সঙ্গে সমন্বয় করে মন্ত্রণালয়ে প্রাক্কলন (এস্টিমেট) পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে।”
এ বিষয়ে মানবেন্দ্র ঘোষের চাচা শিশির ঘোষ বলেন, “গত বছর পহেলা বৈশাখে তিনি বাঘের মোটিফ তৈরি করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয় যে, তিনি শেখ হাসিনার মোটিফ বানিয়েছেন। এই মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন হুমকি আসতে থাকে। একপর্যায়ে ১৫ এপ্রিল রাতে দুর্বৃত্তরা তার স্টুডিওতে আগুন দেয়। এতে তার ছাত্রজীবনসহ সব শিল্পকর্ম পুড়ে যায়। তখন ডিসি থেকে শুরু করে অন্তর্বর্তী সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেন, কিন্তু এক বছরেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা এখনো নানা ধরনের হুমকির মধ্যে আছি। মামলার কী অবস্থা, কারা আসামি, কেউ ধরা পড়েছে কি না এসব কিছুই আমরা জানি না।”
বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক, অবসরপ্রাপ্ত সহকারী অধ্যাপক আশুতোষ রায় বলেন, “শুধু মানিকগঞ্জ নয়, সারা দেশেই সংখ্যালঘুদের ওপর বিভিন্ন সময়ে হামলার ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রে মামলা হলেও বিচার হয়নি। মানবেন্দ্র ঘোষের ঘটনায়ও সহায়তার আশ্বাস থাকলেও বাস্তবায়ন হয়নি। আমরা তার স্টুডিও পুনর্নির্মাণ এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
উদীচী মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সাবেক সভাপতি গাজী ওয়াজেদ আলম লাবলু বলেন, “সরকার যখন আশ্বাস দিয়েছিল, আমরা বিশ্বাস করেছিলাম। তার যে ক্ষতি হয়েছে, তা পূরণ করা কঠিন। তবে তার মনোবল ফিরিয়ে আনতে সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত। দীর্ঘ সময় পার হলেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই।”
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সারওয়ার আলম বলেন, “গত এপ্রিল মাসে মামলাটি দায়ের করা হয়। এ পর্যন্ত সন্দেহভাজন ১১ জনকে আটক করা হয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে যারা সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।”
তিনি আরও জানান, “মামলাটি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। খুব শিগগিরই চার্জশিট দেওয়া হবে। যাদের সম্পৃক্ততা নেই, তারা মামলায় থাকবে না।”
জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “আমি নতুন যোগদান করেছি। শিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষের সঙ্গে দেখা ও কথা হয়েছে। এডিসি (উন্নয়ন)কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এলজিআরডির সঙ্গে সমন্বয় করে স্টুডিও পুনর্নির্মাণের প্রাক্কলন তৈরি করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। দ্রুতই ফল পাওয়া যাবে বলে আশা করছি।”
উল্লেখ্য, গত পহেলা বৈশাখের শোভাযাত্রায় ‘শেখ হাসিনা’ মোটিফ তৈরির অভিযোগ তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চারুশিল্পী মানবেন্দ্র ঘোষকে হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তার জন্য তিনি থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১৫ এপ্রিল গভীর রাতে তার স্টুডিওতে অগ্নিকাণ্ড ঘটে। এতে তার ছাত্রজীবনসহ সব শিল্পকর্ম পুড়ে যায়। ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিলে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা ও জেলা প্রশাসন তার স্টুডিও পুনর্নির্মাণের আশ্বাস দেয়।
১২৬ বার পড়া হয়েছে