জামালপুরে জৈব মালচিং প্রযুক্তিতে চাষ স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভ
সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:৫৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জৈব মালচিং ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার করে স্বল্প বিনিয়োগে অধিক লাভের সফল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন ইসলামপুর উপজেলার গোয়ালেরচর ইউনিয়নের সভারচর গ্রামের কৃষক দেলোয়ার হোসেন।
সোমবার ১৩ এপ্রিল সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ওয়ার্ল্ড ভিশন ও উন্নয়ন সংঘের বাস্তবায়নাধীন জেসমিন প্রকল্পের আওতায় কৃষক দেলোয়ার হোসেন মরিচ চাষে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছেন। তার চাষকৃত মরিচের উৎপাদন, চাষ প্রক্রিয়া, বিক্রি, লাভ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানলে স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।
দেলোয়ার হোসেন জানান, আগে তিনি প্রচলিত পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করতেন। এবার জেসমিন প্রকল্পের উৎপাদক দলের সভায় অংশগ্রহণ করে জৈব মালচিং পদ্ধতিতে চাষের মাধ্যমে অধিক লাভের বিষয়টি জানতে পারেন। প্রকল্পের কর্মীদের পরামর্শ ও সার্বিক সহযোগিতায় তিনি “অস্থির-১” জাতের মরিচের বীজ সংগ্রহ করেন এবং জৈব মালচিং পদ্ধতির নিয়ম অনুযায়ী ক্ষেত প্রস্তুত করেন।
তিনি বলেন, মাত্র তিন মাসের মধ্যেই মরিচ সংগ্রহ শুরু হয়। পরীক্ষামূলকভাবে ১০ শতাংশ জমিতে মরিচ চাষে তার মোট ব্যয় হয় ১৫ হাজার টাকা। গত অক্টোবর মাসে আবাদ শুরু করে এ পর্যন্ত তিনি মরিচ বিক্রি করেছেন ৬১ হাজার টাকার। বন্যা না আসা পর্যন্ত আরও মরিচ বিক্রি করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার ধারণা, আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করা যাবে। বর্তমানে মরিচের বাজারদরও ভালো রয়েছে।
দেলোয়ার হোসেন জানান, জৈব মালচিং পদ্ধতির কারণে মাত্র দুইবার সেচ দিতে হয়েছে। ক্ষেতে আগাছা কম হওয়ায় শ্রমিক খরচও অনেক কম লেগেছে, যা এ পদ্ধতির অন্যতম বড় সুবিধা।
অন্যদিকে তিনি আরও জানান, একই এলাকার পাশের ২০ শতাংশ জমিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করে ২০ হাজার টাকা খরচে মাত্র ৩০ হাজার টাকার মরিচ বিক্রি করেছেন। ওই ক্ষেতের ফলন তিন মাসের মধ্যেই শেষ হয়ে যাওয়ায় পরে সেখানে অন্য ফসল আবাদ করতে হয়েছে। তুলনামূলকভাবে তিনি জানান, হাইব্রিড মরিচ চাষে তিনি অধিক লাভবান হয়েছেন।
দেলোয়ার হোসেনের সফল চাষাবাদ দেখে এলাকার অন্যান্য কৃষকরাও আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। অনেক কৃষক তার ক্ষেত পরিদর্শনে আসছেন এবং আগামীতে জৈব মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। একই সঙ্গে উৎপাদক দলের সদস্য হতে এবং সভায় অংশগ্রহণের জন্য অনেকেই তাকে অনুরোধ করছেন।
তিনি জানান, মরিচ চাষের মাধ্যমে তিনি সংসারের স্বচ্ছলতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সঞ্চয়ও করতে সক্ষম হয়েছেন। ভবিষ্যতে তিনি ৩০ শতাংশ জমিতে জৈব মালচিং পদ্ধতিতে মরিচ চাষ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করেছেন। এ জন্য তিনি সহজ শর্তে ঋণ, আরও প্রশিক্ষণ এবং ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ভিশন ও উন্নয়ন সংঘের সহযোগিতা কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে ওয়ার্ল্ড ভিশনের জেসমিন প্রকল্পের কৃষি বিশেষজ্ঞ ড. পরিমল সরকার বলেন, তারা জামালপুরে প্রথম কৃষকদের জৈব মালচিং পদ্ধতিতে চাষে উৎসাহিত করেছেন। মরিচসহ মোট সাতটি নির্বাচিত ফসল নিয়ে তারা কাজ করছেন এবং প্রায় প্রতিটি ফসলেরই প্রদর্শনী প্লট তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সাধারণ পদ্ধতির তুলনায় জৈব মালচিং ও আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদে কৃষকরা অধিক লাভবান হচ্ছেন, যা তাদের প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, মাটির স্বাস্থ্য সংরক্ষণ এবং স্বল্প ব্যয়ে অধিক ফলনের লক্ষ্যে জৈব মালচিং পদ্ধতি জনপ্রিয় করা হবে বলেও তিনি জানান।
প্রদর্শনী প্লট পরিদর্শনের আগে সভারচর উৎপাদক দলের সঙ্গে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দলের দায়িত্ব, কর্তব্য, কার্যক্রম এবং অর্জন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। পরে ইসলামপুর জেসমিন প্রকল্পের জ্যেষ্ঠ কর্মীদের সঙ্গে একটি পর্যালোচনা সভাও অনুষ্ঠিত হয়।
মাঠ পরিদর্শনকালে উপস্থিত ছিলেন উন্নয়ন সংঘের মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিচালক জাহাঙ্গীর সেলিম, ওয়ার্ল্ড ভিশনের লাইভলিহুড ম্যানেজার মো. মোশফেকুর রহমান, জেসমিন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক অসীম চ্যাটার্জি, ভ্যালুচেইন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ কবির, নিউট্রিশন বিশেষজ্ঞ নাহিদা ইসলাম, জেন্ডার বিশেষজ্ঞ শফিকুর রহমান, কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ কওনান মোরছালিন, এমঅ্যান্ডই ম্যানেজার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং উন্নয়ন সংঘের জেসমিন প্রকল্পের উপজেলা সমন্বয়কারী বিজন কুমার দেব।
১৪১ বার পড়া হয়েছে