ট্রাম্পের এক বছরে মন্দ–ভালো
বুধবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২৬ ৬:২২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ওয়াশিংটনে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছর শেষ করলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ক্ষমতায় ফেরার পর অভিবাসন, সীমান্ত, পররাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ শাসনে একের পর এক কড়া ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে দেশ–বিদেশে তুমুল আলোচনার জন্ম দিয়েছেন তিনি; সমালোচকদের ভাষায় এটি ছিল “অভিযান আর প্রতিশোধের বছর”, সমর্থকদের মতে “কঠোর নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন”।
মন্দ কাজের এক বছর
ক্ষমতায় ফিরেই ট্রাম্প ভেনিজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত ও গ্রেপ্তার করান; তেল–রাজনীতিনির্ভর এই ‘রেজিম চেঞ্জ’ পদক্ষেপকে লাতিন আমেরিকা ও আন্তর্জাতিক মহল সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নজিরবিহীন উদাহরণ হিসেবে নিন্দা করেছে। একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা ও লাগাতার হুমকিতে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যদিও ওয়াশিংটন এটাকে “নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ” বলে ব্যাখ্যা করছে।
ইউক্রেন ইস্যুতে কড়াকড়ি সহায়তার বদলে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে প্রকাশ্য ঝগড়া, লাইভ বৈঠকে অপমানজনক মন্তব্য ও কিয়েভের ওপর সমঝোতার চাপ ট্রাম্পকে রাশিয়ার পক্ষে নরম অবস্থানে রেখেছে—এমন অভিযোগ উঠেছে পশ্চিমা কূটনৈতিক মহলে। মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কেও কানাডা ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর নতুন ট্যারিফ ও ট্যারিফ–হুমকি, কানাডাকে ‘৫১তম স্টেট’ বানানোর দাবি এবং গ্রিনল্যান্ড “অধিগ্রহণ”–সুলভ বক্তব্য ন্যাটো–মিত্রতার ভেতর গভীর অস্বস্তি তৈরি করেছে।
ভেতরে, অভিবাসন ও সীমান্তনীতিতে জরুরি অবস্থা জারি, ব্যাপক রেইড ও ডিপোর্টেশনে অবৈধ প্রবেশ কমলেও আশ্রয়–প্রক্রিয়া কার্যত বন্ধের মুখে এবং শরণার্থী গ্রহণ ন্যূনতম পর্যায়ে নামায় মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তীব্র হয়েছে। জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট, এফবিআই ও ফেডারেল আমলাতন্ত্রে দল–ঘনিষ্ঠদের বসিয়ে বিচারব্যবস্থা রাজনৈতিকীকরণ, ৬ জানুয়ারির দাঙ্গা–সম্পৃক্ত অসংখ্য ব্যক্তিকে ক্ষমা এবং বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, এনজিও ও মিডিয়ার বিরুদ্ধে তদন্ত–ফান্ড কেটে সমালোচক–দমন—এসবকেই বিশ্লেষকেরা গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ভাঙচুরের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন।
অর্থনীতিতে বাজেট ঘাটতি কমানোর যুক্তিতে SNAP–খাদ্যসহ সামাজিক সেফটি–নেট কর্মসূচি ও নানা কল্যাণ–স্কিমে বড় কাটছাঁটে নিম্ন আয়ের পরিবার, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জলবায়ু–বিধিনিষেধ শিথিল, গ্রিন ফান্ড কমানো ও সরকারি ডাইভারসিটি–ইক্যুইটি–ইনক্লুশন (DEI) কর্মসূচি বন্ধের ফলে জলবায়ু–অভিযান ও সংখ্যালঘু অধিকারের অগ্রগতি উল্টোদিকে ঘুরেছে—এমন অভিযোগ তুলেছেন অধিকারকর্মীরা। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে নীতি–বিরোধী বিক্ষোভে ফেডারেল বাহিনী ও ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েন, কড়া দমন–নীতিকে নাগরিক স্বাধীনতার জন্য বিপজ্জনক সঙ্কেত হিসেবে আখ্যা দেওয়া হচ্ছে।
ভালো কাজের এক বছর
সব সমালোচনা সত্ত্বেও অপরাধ ও মাদক দমনে কিছু সূচকে উন্নতি দেখা গেছে; কয়েকটি বড় শহরে হত্যাকাণ্ড ও সহিংস অপরাধের হার কমা এবং ফেন্টানিলসহ বিপজ্জনক মাদক জব্দের পরিমাণ বাড়াকে ট্রাম্প প্রশাসন “ল অ্যান্ড অর্ডার” নীতির বাস্তব সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছে। অর্থনীতিতে দেশীয় তেল–গ্যাস উত্তোলন বাড়িয়ে জ্বালানির দাম কিছুটা কমানো, নির্দিষ্ট মধ্যবিত্ত ও সিনিয়র নাগরিকদের জন্য কর–রাহাত এবং দেশীয় বিনিয়োগ ও রি–শোরিং উৎসাহিত করার পদক্ষেপ ব্যবসা ও শিল্প খাতে আংশিক স্বস্তি এনেছে।
পররাষ্ট্রনীতিতে ইসরায়েল–হামাস সংঘর্ষে গাজায় যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছে, তা এক বছরের মাথায় বড় ধরনের ভাঙন ছাড়া টিকে থাকায় ট্রাম্প নিজেকে শান্তি–উদ্যোগের দাবিদার হিসেবে সামনে এনেছেন, যদিও একই সঙ্গে ইরান–ভেনিজুয়েলা ইস্যুতে আগ্রাসী পদক্ষেপের সমালোচনা জারি রয়েছে। ন্যাটো মিত্রদের প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে প্রবল চাপ, ইন্দো–প্যাসিফিকে চীনা প্রভাব ঠেকাতে ফিলিপাইনসহ আঞ্চলিক জোট জোরদার এবং কিছু লাতিন দেশে চীন–ঘেঁষা প্রকল্প পুনর্বিবেচনার উদ্যোগকে সমর্থকরা কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
ফেডারেল রেগুলেশন ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর পদক্ষেপও ব্যবসা–মহলে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া পেয়েছে; ট্রাম্প শিবিরের ভাষায় “রেড টেপ কাটছাঁটে” নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে, যদিও সমালোচকেরা এর সামাজিক ও পরিবেশগত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। এক কথায়, দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম বছরে ট্রাম্পের নীতিতে মন্দের তালিকা যত দীর্ঘ হয়েছে, সমর্থক–মহলে অপরাধ দমন, কিছু অর্থনৈতিক সূচক, গাজা যুদ্ধবিরতি ও চীন–প্রভাব মোকাবিলার মতো কয়েকটি দিককে ভালো কাজ হিসেবে সামনে আনা হচ্ছে।
এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে যেমন কঠোর নিরাপত্তা–অর্থনীতি ও আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতির পথে এগিয়েছে, তেমনি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান, মানবাধিকার ও মিত্রতার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তাও তৈরি করেছে। সমর্থক ও সমালোচকের তীব্র বিভাজনের ভেতর দিয়ে দ্বিতীয় মেয়াদের এই প্রথম বছরটি শেষ হওয়ায়, সামনে ট্রাম্প কোন পথে হাঁটবেন—তা এখন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট।
২৮৩ বার পড়া হয়েছে