ইসরায়েলে সরকার গঠন নিয়ে জটিলতা, আবারও নির্বাচনের শঙ্কা!
শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট গণনা শেষ হলেও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। কোনো রাজনৈতিক জোটই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে দেশটিতে নতুন সরকার গঠন নিয়ে জটিল রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। আগামী ১২ সপ্তাহের মধ্যে দলগুলো সমঝোতায় পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে আবারও নির্বাচন হতে পারে। এতে আরও কয়েক মাস তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাচ্ছেন বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
ইসরায়েলের নির্বাচনে প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে একটির নেতৃত্বে রয়েছে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী দল লিকুদ। অন্যটির নেতৃত্বে সাবেক সেনা কর্মকর্তা গাদি আইজেনকোটের মধ্যপন্থী দল ইয়াশার। ভোট গণনা শেষে নেতানিয়াহুর জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে আইজেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৪৮। বাকি ১৯টি আসন পেয়েছে আরব দলগুলোর জোট।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় এখন রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন সমঝোতার পথ খুঁজতে হচ্ছে। তবে দেশটির রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিভাজন এতটাই গভীর যে, এ প্রক্রিয়া সহজ হবে না। তবু সরকার গঠনের কয়েকটি সম্ভাব্য পথ খোলা রয়েছে।
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে ইহুদি ও আরব দলগুলোর সমর্থনে একটি বিরোধী সরকার গঠন। তবে এ উদ্যোগের বড় বাধা আদর্শিক মতপার্থক্য।
বিরোধী জোটের ডানপন্থী দুই নেতা নাফতালি বেনেট ও আভিগদর লিবারম্যান আরব দল রাআম এবং জয়েন্ট লিস্টের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠনে আগ্রহী নন। সরকারে সরাসরি অংশগ্রহণ কিংবা বাইরে থেকে সমর্থন—কোনো ক্ষেত্রেই আরব দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতায় তাঁদের অনীহা রয়েছে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর আরব দলগুলোর বিষয়ে তাঁদের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
ইসরায়েলের ইতিহাসে মাত্র একবার কোনো আরব দল সরাসরি সরকারে অংশ নিয়েছিল। ২০২১ সালে রাআম আট দলীয় একটি জোট সরকারের অংশ হয়। ওই জোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে সক্ষম হলেও এক বছরের মাথায় ভেঙে যায়।
তবে সরকার গঠন করতে না পারলেও বিরোধী দলগুলো পার্লামেন্টে একসঙ্গে কাজ করতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার সমর্থন নিয়ে তারা নেসেটের স্পিকারসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে পরিবর্তন আনতে পারে। এর মাধ্যমে নেতানিয়াহুর তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ক্ষমতাও সীমিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সরকার গঠনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো, দুই রাজনৈতিক জোটের কয়েকটি দল মিলে জাতীয় ঐক্যের সরকার প্রতিষ্ঠা করা। এ ধরনের সরকারে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এবং তাঁর বর্তমান জোটের কয়েকটি শরিক দল থাকতে পারে। পাশাপাশি বিরোধী জোটের অন্তত একটি দলকে সরকারে যুক্ত হতে হবে।
বিরোধী দলকে সরকারে জায়গা করে দিতে নেতানিয়াহু তাঁর কট্টর ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এবং ধর্মীয় দলগুলোকে বাদ দিতে তিনি রাজি হবেন কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
অন্যদিকে গাদি আইজেনকোট নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা সরাসরি নাকচ করেছেন। তাঁর মতে, এমন সিদ্ধান্ত নিলে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে আগ্রহী ভোটারদের কাছে তা বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
বিরোধী জোটের সংসদ সদস্য কিংবা স্বতন্ত্র আইনপ্রণেতাদের নিজের পক্ষে টানার চেষ্টাও করতে পারেন নেতানিয়াহু। তবে বিরোধী জোটের চার নেতা—গাদি আইজেনকোট, নাফতালি বেনেট, আভিগদর লিবারম্যান ও ইয়ার গোলান—নেতানিয়াহুর সঙ্গে সরকার গঠনে অংশ না নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
বর্তমান হিসাবে নেতানিয়াহুর জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন থেকে আট আসন পিছিয়ে রয়েছে। ফলে সরকার গঠনের জন্য আটজন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যকে নিজের পক্ষে আনা তাঁর জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ হবে।
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ পার্লামেন্টে আসন পাওয়া দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে সরকার গঠনের দায়িত্ব দেবেন একজন নেতাকে। এ ক্ষেত্রে দলগুলোর মতামত ও সমর্থনের হিসাব বিবেচনায় নেওয়া হবে।
ধারণা করা হচ্ছে, আরব দলগুলো গাদি আইজেনকোটের প্রতি সমর্থন জানাতে পারে। সে ক্ষেত্রে ইয়াশার দলের নেতা সরকার গঠনের প্রথম সুযোগ পেতে পারেন।
প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে দায়িত্ব পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নেতা সরকার গঠনের জন্য ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজনে এ সময় আরও ১৪ দিন বাড়ানো সম্ভব। প্রথম ব্যক্তি ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট দ্বিতীয় একজন নেতাকে দায়িত্ব দিতে পারবেন। তাঁর জন্যও সময় থাকবে ২৮ দিন।
দ্বিতীয় প্রচেষ্টাও ব্যর্থ হলে নেসেটের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যরা প্রেসিডেন্টের কাছে তৃতীয় একজন প্রার্থীকে দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধ জানাতে পারবেন। ওই প্রার্থী সরকার গঠনের জন্য ১৪ দিন সময় পাবেন।
সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে দেশটিতে আবারও পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সরকার গঠনের এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় তুলনামূলক সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন নেতানিয়াহু। কারণ, নতুন সরকার গঠিত না হওয়া পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে তাঁর।
গাদি আইজেনকোট প্রথম সুযোগ পেয়েও সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে পরবর্তী সময়ে দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে নেতানিয়াহুর। তিনিও ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক অচলাবস্থা আরও দীর্ঘ হতে পারে। শেষ পর্যন্ত নতুন নির্বাচন ছাড়া সমাধানের পথ না-ও থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, রাজনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত থাকলে আগামী মার্চ কিংবা মে মাসের আগে নতুন নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা কম। এমনটি হলে আট বছরের মধ্যে সপ্তমবারের মতো পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে হবে ইসরায়েলিদের।
১২২ বার পড়া হয়েছে