বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়ার পূর্বাভাস
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:২১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ, জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন এবং খাদ্যপণ্য পরিবহনে সংকটের কারণে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম ২৩ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। সংস্থাটির আশঙ্কা, সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি, খাদ্য ও ধাতুর বাজারে অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে সমস্যা এবং নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে স্বর্ণসহ মূল্যবান ধাতুর চাহিদা বৃদ্ধিকে এর প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিশ্বব্যাংক।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) প্রকাশিত সংস্থাটির সর্বশেষ পণ্যবাজারবিষয়ক পূর্বাভাস প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন সংকটের কারণে তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, খাদ্যপণ্য ও ধাতুর দাম বেড়েছে। পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে পণ্যের দাম সামগ্রিকভাবে ৭ শতাংশ কমতে পারে। তবে প্রতিকূল আবহাওয়া, সরবরাহসংকট ও অন্যান্য ঝুঁকি অব্যাহত থাকলে খাদ্যপণ্যের দাম উচ্চ পর্যায়ে থেকে যেতে পারে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণের প্রয়োজন হতে পারে।
সংস্থাটির মতে, নতুন কোনো সরবরাহসংকট দেখা দিলে তা মোকাবিলার ক্ষেত্রে বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক তেলের মজুত কমেছে। ফলে ২০২৬ সালে বিশ্বে তেলের সরবরাহ ৫ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। ২০২০ সালের বৈশ্বিক মন্দার সময় বাদ দিলে চার দশকের মধ্যে তেলের সরবরাহে এটিই হতে পারে সবচেয়ে বড় পতন।
বিশ্বব্যাংকের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ আয়হান কোসে বলেন, পণ্যবাজার একই সময়ে বেশ কয়েকটি বড় ধাক্কার মুখে পড়েছে। জ্বালানির উচ্চমূল্য ও বাণিজ্যে বিঘ্নের কারণে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্বের সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া এবং ঋণের চাপে থাকা নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে সহায়তা করা বিশ্বব্যাংকের অন্যতম অগ্রাধিকার।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ২৫টি দেশকে ইতোমধ্যে স্বল্প সুদের ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা হিসেবে ৮৭০ কোটি ডলার দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এর মধ্যে ১০টি দেশে সংকট মোকাবিলায় বিদ্যমান কর্মসূচি পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে এবং ১৯টি দেশ নতুন অর্থায়ন পেয়েছে। কয়েকটি দেশ দুই ধরনের সহায়তাই পেয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম ৩২ শতাংশ বাড়তে পারে। এতে ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পর জ্বালানির দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে।
তেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় নিকট ভবিষ্যতে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে। চলতি বছর প্রতি ব্যারেল ব্রেন্ট তেলের গড় দাম ৯২ ডলার হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।
তবে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ায় দাম আরও বাড়ার চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, চলতি বছর বিশ্বে তেলের চাহিদা ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমতে পারে। করোনা মহামারিজনিত সংকট এবং ১৯৮০ সালের তেলসংকটের পর এটি হবে তেলের চাহিদা কমে যাওয়ার তৃতীয় বৃহত্তম ঘটনা।
কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের সংঘাতের কারণে শস্য পরিবহনে বিঘ্ন সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রভাবে ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দাম ১০ শতাংশের কিছু বেশি বাড়তে পারে। ২০২৭ সালে দাম আরও ৭ শতাংশের বেশি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে দুই বছরে খাদ্যপণ্যের দাম মোট প্রায় ১৮ শতাংশ বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংক বলেছে, পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে খাদ্যপণ্যের দাম পূর্বাভাসের তুলনায় ১২ শতাংশ বেশি হতে পারে। রেকর্ড মাত্রার এল নিনো, কৃষ্ণসাগরে শস্য পরিবহনে নতুন করে বিঘ্ন, পশ্চিম এশিয়ার সংঘাতের বিস্তার এবং রাশিয়ার তেল অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি অব্যাহত থাকলে এ ঝুঁকি বাড়বে।
এমন পরিস্থিতিতে ২০১০-এর দশকের শুরুর দিকের মতো খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় খাদ্যসংকটের কারণে অতিরিক্ত ৪ কোটির বেশি মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়ে।
চলতি বছর বিশ্ববাজারে সারের দাম ১৪ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। মূলত ইউরিয়ার মূল্যবৃদ্ধির কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। তবে ২০২৭ সালে সারের দাম আবার ২০২৫ সালের পর্যায়ে ফিরে আসতে পারে।
এদিকে, ২০২৬ সালে ধাতুর দাম ২৫ শতাংশ বাড়তে পারে। সরবরাহে বিঘ্নের পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং তথ্যকেন্দ্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধির কারণে অ্যালুমিনিয়াম, তামা ও টিনের চাহিদা বাড়ছে। এতে এসব ধাতুর দাম নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে।
ভূরাজনৈতিক ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান ধাতুর চাহিদাও বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে ২০২৬ সালে মূল্যবান ধাতুর দাম ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তবে ২০২৭ সালে দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে আসতে পারে।
সূত্র: রয়টার্স
১১৯ বার পড়া হয়েছে