চাঁপাইনবাবগঞ্জে বারোমাসি আমের বাজার: দিনে কোটি টাকার বেচাকেনা
বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬ ১০:১২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
‘আমের রাজধানী’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে মৌসুমি আমের পাশাপাশি সারা বছর আম বেচাকেনার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। জেলার গোমস্তাপুর উপজেলার বোয়ালিয়া এলাকায় কৃষকদের উদ্যোগে গড়ে উঠেছে বারোমাসি আমের বিশেষ বাজার। স্থানীয়ভাবে ‘কাটিমন আমের বাজার’ নামে পরিচিত এ বাজারে প্রতিদিন গড়ে প্রায় কোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমের মৌসুম সাধারণত কয়েক মাসকে কেন্দ্র করে জমে ওঠে। শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে অসংখ্য আমবাগান। ফজলি, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত ও গোপালভোগসহ বিভিন্ন জাতের আমের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দেশজুড়ে পরিচিত এ জেলা। শিবগঞ্জের কানসাট আমবাজারও দেশের অন্যতম বড় পাইকারি আমের বাজার হিসেবে পরিচিত।
তবে মৌসুম শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমের বেচাকেনাও অনেকটা কমে যায়। ফলে বছরের কয়েক মাসই আমকে ঘিরে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের বড় ধরনের আয় হতো। উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও কোনো কোনো বছর ফলন কমে যাওয়ায় লোকসানের মুখেও পড়তে হয়েছে অনেক কৃষককে।
এ পরিস্থিতিতে জেলার কিছু কৃষক পুরোনো আমগাছের পরিবর্তে বারোমাসি ও নাবি জাতের আমের চাষ শুরু করেন। বিশেষ করে থাইল্যান্ডের কাটিমনসহ বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের আম চাষে তাঁদের আগ্রহ বাড়ছে। বছরের বিভিন্ন সময়ে ফলন পাওয়ার সুযোগ থাকায় এসব জাত কৃষকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
গোমস্তাপুরের বোয়ালিয়া এলাকায় কয়েক বছর আগে অল্প কয়েকজন কৃষক বারোমাসি আম স্থানীয়ভাবে বিক্রি শুরু করেন। ধীরে ধীরে এ ধরনের আমের বাগান ও উৎপাদন বাড়তে থাকে। একই সঙ্গে বাড়ে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যাও। একপর্যায়ে নিয়মিত বাজারে পরিণত হয় এলাকাটি।
সম্প্রতি বোয়ালিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, আমগাছের নিচে সারি সারি ভ্যান দাঁড়িয়ে আছে। কোনো ভ্যানে কাঁচাপাকা কাটিমন আম, আবার কোনো ভ্যানে সাজানো হয়েছে পাকা আম। বাগান থেকে আম এনে বিক্রির জন্য অপেক্ষা করছেন কৃষকেরা। ক্রেতারা এক ভ্যান থেকে আরেক ভ্যানে ঘুরে আমের মান দেখছেন এবং দরদাম করছেন।
চৌডালা এলাকার কৃষক ওলিউল ইসলাম নিজের বাগানের আম নিয়ে বাজারে এসেছিলেন। তিনি জানান, কয়েক বছর মৌসুমি আম চাষ করে লোকসানের মুখে পড়ার পর পুরোনো আমগাছ কেটে কাটিমন আমের চাষ শুরু করেন। কয়েক বছর ধরে তিনি এই বাজারেই আম বিক্রি করছেন।
ওলিউল ইসলামের ভাষ্য, বারোমাসি আমের উৎপাদন দিন দিন বাড়ছে। তবে উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতি মণ আমের দাম প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার টাকা কম পাওয়া যাচ্ছে।
বোয়ালিয়া বাজারে ভ্রাম্যমাণ আম ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয়। তিনি আগে মৌসুমি আমের সময় কানসাট বাজার থেকে আম কিনে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন। আমের মৌসুম শেষ হলে তাঁর ব্যবসাও বন্ধ হয়ে যেত।
শফিকুল ইসলাম বলেন, বারোমাসি আমের কারণে এখন বছরের অধিকাংশ সময় আমের ব্যবসা করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। আগে কানসাট থেকে আম কিনলেও বর্তমানে বোয়ালিয়া বাজার থেকেই আম সংগ্রহ করছেন তিনি।
তবে বাজারটির যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামো আরও উন্নত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন এই ব্যবসায়ী। তাঁর মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এখনো বোয়ালিয়া বাজারের পরিচিতি তেমন নেই। সড়ক প্রশস্ত করা এবং বাজারের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো গেলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আরও বেশি ক্রেতা-বিক্রেতা আসবেন। এতে কৃষকেরাও আমের ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কানসাট থেকে বোয়ালিয়া বাজারে আম কিনতে আসা ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি নিয়মিত এ বাজার থেকে আম কিনে অনলাইনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইনভিত্তিক ব্যবসার বিস্তারের কারণে বারোমাসি আমের জন্য নতুন বাজার তৈরি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বারোমাসি আমের চাষ ও বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে শুধু কৃষকেরাই নন, স্থানীয়ভাবে আরও অনেক মানুষ যুক্ত হচ্ছেন। ভ্যানচালক, পরিবহন শ্রমিক, পাইকার, আড়তদার ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের কাজের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। মৌসুমের বাইরেও আমের বাজার সচল থাকায় তাঁদের আয়-রোজগারের ক্ষেত্রও বাড়ছে।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, সম্ভাবনা থাকলেও বাজারটির সামনে এখনো কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। সরু সড়ক, পর্যাপ্ত বাজার অবকাঠামোর অভাব, সংরক্ষণ সুবিধার সীমাবদ্ধতা এবং দেশব্যাপী পরিচিতির ঘাটতি এর মধ্যে অন্যতম। যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি সংরক্ষণ ও পরিবহন সুবিধা বাড়ানো গেলে বাজারটির পরিধি আরও বাড়তে পারে।
এতদিন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের ঐতিহ্য মূলত কয়েক মাসের মৌসুমি উৎপাদন ও বাণিজ্যকে ঘিরে ছিল। কৃষকদের উদ্যোগে বারোমাসি আমের চাষ এবং বোয়ালিয়ায় গড়ে ওঠা বাজার সেই চিত্রে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মৌসুম শেষ হওয়ার পরও সেখানে নিয়মিত কাঁচা-পাকা আমের বেচাকেনা চলছে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন করা গেলে বোয়ালিয়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ বারোমাসি আমের বাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। এতে ‘আমের রাজধানী’ চাঁপাইনবাবগঞ্জের দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যের সঙ্গে সারা বছর আম উৎপাদন ও বাণিজ্যের নতুন সম্ভাবনা যুক্ত হবে।
বারোমাসি আম চাষ ও বোয়ালিয়া বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. আতিকুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
১১৮ বার পড়া হয়েছে