ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
লুলাকে পেছনে ফেলে রানঅফে ফ্লাভিও বলসোনারো
সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:২৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও বামপন্থী নেতা লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভাকে পেছনে ফেলেছেন ডানপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। তবে প্রয়োজনীয় ৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেননি তিনি। আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলার সঙ্গে ফ্লাভিওর লড়াই হবে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফার ভোটে অপ্রত্যাশিতভাবে এগিয়ে গেছেন ডানপন্থী সেনেটর ফ্লাভিও বলসোনারো। ৯৯ শতাংশ ভোট গণনার পর তিনি পেয়েছেন ৪৭ দশমিক ০৩ শতাংশ ভোট। অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা পেয়েছেন ৪৫ দশমিক ১৬ শতাংশ ভোট।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন জনমত জরিপে লুলা প্রায় তিন শতাংশ পয়েন্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকবেন বলে ধারণা করা হয়েছিল। সেই হিসাবে প্রথম দফায় ফ্লাভিওর ফলাফল প্রত্যাশার চেয়ে ভালো হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৫০ শতাংশের বেশি ভোট না পাওয়ায় প্রথম দফাতেই কোনো প্রার্থী বিজয়ী হতে পারেননি। ফলে আগামী ২৫ অক্টোবর দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা ও ফ্লাভিও মুখোমুখি হবেন।
ফ্লাভিও সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারোর ছেলে। ২০২২ সালের নির্বাচনে লুলার কাছে পরাজিত হওয়ার পর ‘অভ্যুত্থানের ষড়যন্ত্রের’ অভিযোগে জাইর বলসোনারো ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন।
প্রথম দফার ফল প্রকাশের পর ব্রাসিলিয়ায় সাংবাদিকদের ফ্লাভিও বলেন, ‘ব্রাজিল পরিবর্তন চায়’ এবং ভোটের ফলে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত। একই সঙ্গে লুলার ওয়ার্কার্স পার্টির শাসনের ‘সমাপ্তি’র কথাও বলেন তিনি।
অন্যদিকে সাও পাওলোতে সমর্থকদের উদ্দেশে লুলা বলেন, প্রথম দফাতেই তিনি জয়ী হবেন বলে নিশ্চিত ছিলেন। তবে এখন দ্বিতীয় দফার জন্য নতুন করে প্রচারে নামবেন এবং তাঁর সরকারের অর্জনগুলো ভোটারদের সামনে তুলে ধরবেন।
লুলা বলেন, খেলা এখন শুরু হতে যাচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, অতিরিক্ত সময়েই ব্রাজিলের জনগণের সমর্থন অর্জন করবেন।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে অধিকাংশ জনমত জরিপে লুলাকে ফ্লাভিওর চেয়ে এগিয়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু ভোটের ফল সেই হিসাবকে বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে।
ইগারাপে ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা রবার্ট মুগার মতে, জনমত জরিপকারীরা বড় ধরনের ভুল করেছেন। দ্বিতীয় দফার ভোটের জরিপেও ফ্লাভিওর অবস্থান কম করে দেখানো হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
প্রথম দফায় বাদ পড়া প্রার্থীদের মধ্যে ডানপন্থী ভোটের বড় একটি অংশ রয়েছে। ফলে দ্বিতীয় দফায় এসব ভোট ফ্লাভিওর পক্ষে যেতে পারে বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
প্রথম দফার ফলাফলে গভর্নর, সেনেটর ও ফেডারেল ডেপুটি পদে ফ্লাভিওর লিবারেল পার্টি ভালো ফল করেছে। এতে কংগ্রেসেও দলটির শক্ত অবস্থান তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, দুর্নীতি ও নিরাপত্তা ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেশে বৈষম্য ও বেকারত্ব কমলেও নিত্যদিনের ব্যয় বৃদ্ধি, পরিবারের ঋণের চাপ, অপরাধ ও গ্যাং তৎপরতার কারণে লুলা ভোটারদের সমর্থন ধরে রাখতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।
ফ্লাভিও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে লুলা অনলাইন জুয়া নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের পাশাপাশি সামাজিক সহায়তা বাড়ানো এবং পরিবারগুলোর ঋণের চাপ কমানোর প্রস্তাব দেন।
সরকারি ব্যয় ও ঋণও নির্বাচনের অন্যতম আলোচিত বিষয় ছিল। ব্রাজিলের সরকারি ঋণ জিডিপির ৮২ শতাংশের বেশি। একই সঙ্গে চলতি ও আগামী বছরের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে যথাক্রমে ২ শতাংশ ও ২ দশমিক ৩ শতাংশ করা হয়েছে।
নির্বাচনী প্রচারের সময় বিভিন্ন কেলেঙ্কারি ও বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগও আলোচনায় আসে। ব্যাঙ্কো মাস্টারকে ঘিরে একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। ব্যাংকটির সাবেক প্রধান দানিয়েল ভোরকারোকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং তাঁর বিরুদ্ধে কয়েক বিলিয়ন ডলারের জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। তিনি অবশ্য অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তদন্তে ব্রাজিলের রাজনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে ভোরকারোর যোগাযোগও খতিয়ে দেখা হয়েছে। ফ্লাভিওর বিরুদ্ধেও অর্থপাচারের অভিযোগের তদন্ত চলছে। তবে তিনি কোনো ধরনের অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন।
ভোটারদের কাছে অপরাধ ও নিরাপত্তা বড় উদ্বেগের বিষয় ছিল। ব্রাজিলে হত্যার হার কমলেও রাস্তায় মুঠোফোন ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ এবং মাদক পাচার বড় সমস্যা হয়ে আছে।
ফ্লাভিও গ্যাংগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা এবং এল সালভাদরের আদলে সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগার নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তাঁর বাবা জাইর বলসোনারো প্রেসিডেন্ট থাকাকালে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার বিধিনিষেধ শিথিল করেছিলেন।
লুলা অবশ্য গ্যাংগুলোকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণার প্রস্তাবের সমালোচনা করেছেন। তিনি সংগঠিত অপরাধের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক মোকাবিলা, হত্যাকাণ্ডের তদন্ত জোরদার এবং কারাগারে বিনিয়োগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
নির্বাচনী প্রচারে ব্রাজিলের সার্বভৌমত্বও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। লুলা বিভিন্ন সময়ে ব্রাজিলের নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ ও প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগ করেছেন। তবে দেশটির সুপ্রিম ইলেক্টোরাল কোর্টের প্রধান জানিয়েছেন, নির্বাচনে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানাননি। তবে তিনি ফ্লাভিও বলসোনারোকে হোয়াইট হাউসে স্বাগত জানিয়েছেন এবং প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা করেছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফ্লাভিও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে মাদক পাচারবিরোধী যুক্তরাষ্ট্রের ‘শিল্ড অব দ্য আমেরিকাস’ জোটে যোগ দিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারেন।
তবে চীনের সঙ্গেও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখার কথা বলেছেন ফ্লাভিও। যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে চীন বর্তমানে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার। দেশটির সয়াবিন ও গরুর মাংস রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বাজারও চীন।
লুলা ব্রাজিলের দরিদ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নিম্ন আয়ের মানুষ, ক্যাথলিক ও নারীদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি জনপ্রিয়। তিনি চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট হওয়ার চেষ্টা করছেন।
২০০২ ও ২০০৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর ২০২২ সালে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফেরেন লুলা। ওই নির্বাচনে তিনি জাইর বলসোনারোকে দুই শতাংশেরও কম ভোটের ব্যবধানে হারান। এটি ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ফলগুলোর একটি।
২০২২ সালের নির্বাচনের পর ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি জাইর বলসোনারোর সমর্থকেরা সরকারি বিভিন্ন ভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালান। জাইর নির্বাচনে নিষিদ্ধ হওয়ার পর তাঁর বড় ছেলে ফ্লাভিওকে প্রার্থী হিসেবে সমর্থন দেন। রোববারের নির্বাচনে জাইরের স্ত্রী মিশেল বলসোনারোও সেনেটর নির্বাচিত হয়েছেন।
ফ্লাভিও নির্বাচিত হলে তাঁর বাবাসহ ৮ জানুয়ারির দাঙ্গায় জড়িত সমর্থকদের সাধারণ ক্ষমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। অন্যদিকে ব্রাজিলের দক্ষিণাঞ্চল, তুলনামূলক সচ্ছল ভোটার ও ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টানদের মধ্যে তাঁর সমর্থন বেশি।
ফলে দ্বিতীয় দফার ভোটে লুলা ও ফ্লাভিওর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। আগামী ২৫ অক্টোবরের ভোটেই নির্ধারিত হবে, ব্রাজিলের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট কে হচ্ছেন।
১০৮ বার পড়া হয়েছে