কক্সবাজার বিমানবন্দরের আন্তর্জাতিক টার্মিনালে পরীক্ষামূলক ফ্লাইট শুরু
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৪৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কক্সবাজার বিমানবন্দরের নবনির্মিত আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল দিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে ফ্লাইট ওঠানামা শুরু হয়েছে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) প্রায় ১৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের আধুনিক এই টার্মিনাল দিয়ে প্রথমবারের মতো ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়। আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এ পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
নতুন আন্তর্জাতিক টার্মিনালে যাত্রীসেবা চালুর প্রথম দিনে পর্যটকদের মধ্যেও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। প্রশস্ত পরিসর, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং দ্রুত লাগেজ পাওয়ার সুবিধায় সন্তুষ্টি জানিয়েছেন যাত্রীরা।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা জানিয়ে আবদুর রহমান নামের এক যাত্রী বলেন, ঢেউয়ের আদলে নির্মিত নতুন টার্মিনালটি তাঁর ভালো লেগেছে। পুরোনো টার্মিনালের তুলনায় এখানে পরিচ্ছন্নতা বেশি এবং হয়রানিও কম হয়েছে বলে জানান তিনি। দ্রুত লাগেজ পাওয়ার বিষয়টিও তাঁর কাছে স্বস্তিদায়ক লেগেছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পর্যাপ্ত জনবলও রয়েছে। পরীক্ষামূলক কার্যক্রমে রানওয়ে, লাইটিং এবং নতুন টার্মিনালের বিভিন্ন ব্যবস্থা যাচাই করা হচ্ছে।
পর্যটন-সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতা জয়নাল আবেদীন হাজারি বলেন, দেশের দীর্ঘতম রানওয়ে ও আধুনিক আন্তর্জাতিক টার্মিনাল নিয়ে কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক মানের সেবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালুর প্রস্তুতির অংশ হিসেবে টার্মিনালটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে। তাঁর মতে, এই অবকাঠামো কক্সবাজারের আকাশপথের যোগাযোগ, পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতিতে পরিবর্তন আনতে পারে।
বিমানবন্দর সূত্র জানায়, সম্প্রসারণের পর কক্সবাজার বিমানবন্দরের রানওয়ের মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৭০০ ফুট। এর প্রায় ১ হাজার ৭০০ ফুট সমুদ্রের ওপর ব্লক বসিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। ফলে বড় আকারের ওয়াইড-বডি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ অবতরণের সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।
রানওয়ের পাশাপাশি উন্নত করা হয়েছে এয়ারফিল্ড ও রানওয়ে লাইটিং ব্যবস্থা। সমুদ্রের ওপর নির্মিত অংশেও প্রয়োজনীয় লাইটিং অবকাঠামো স্থাপন করা হয়েছে। রানওয়েটিকে ক্যাটাগরি-২ অপারেশনের উপযোগী করার কাজও সম্পন্ন হয়েছে।
কক্সবাজার বিমানবন্দর রানওয়ে সম্প্রসারণ প্রকল্পের কো-অর্ডিনেটর এম মোশাররফ হোসেন বলেন, বিদ্যমান রানওয়ের ওপর অ্যাসফাল্টের ওভারলে দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। সম্প্রসারণসহ ১০ হাজার ৭০০ ফুট রানওয়ের নির্মাণকাজও সম্পন্ন হয়েছে। রানওয়ে, লাইটিং ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কাজ শেষ হওয়ায় এটি এখন উদ্বোধনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এর আগে কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে তা স্থায়ী হয়নি। এবার বড় পরিসরের অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে নতুন করে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
রানওয়ের পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়েছে প্রায় ১৭ হাজার ৯৫৫ বর্গমিটারের আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল। যাত্রী ও লাগেজের নিরাপত্তায় এখানে রয়েছে সাতটি স্ক্যানার, আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ব্যবস্থা এবং হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের আলাদা সুবিধা।
দ্রুত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে টার্মিনালে রয়েছে ১৪টি চেক-ইন কাউন্টার ও ১০টি ইমিগ্রেশন ডেস্ক। লাগেজ সংগ্রহের জন্য স্থাপন করা হয়েছে দুটি আধুনিক ব্যাগেজ ক্লেইম বেল্ট। যাত্রীদের চলাচলের সুবিধায় রয়েছে চারটি এসকেলেটর ও ছয়টি লিফট। এ ছাড়া লাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম ও বোর্ডিং ব্রিজসহ বিভিন্ন আধুনিক সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল প্রকল্পের মেকানিক্যাল প্রকৌশলী মো. নুর নবী জানান, হোল্ড ব্যাগেজ স্ক্যানিংয়ের জন্য চারটি এবং কেবিন ব্যাগেজের জন্য তিনটি স্ক্যানার রয়েছে। সিকিউরিটি কন্ট্রোল এলাকায় হোল্ড ব্যাগেজের দ্বিতীয় ধাপের স্ক্যানিং ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আধুনিক মেটাল ডিটেকশন ও ব্যাগেজ কন্ট্রোল সিস্টেম স্থাপন করা হয়েছে। পাসপোর্ট কন্ট্রোল ও ইমিগ্রেশন এলাকাতেও প্রয়োজনীয় স্ক্যানিং সুবিধা রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, টার্মিনালের ব্যবস্থাপনাকে আধুনিক করতে বিভিন্ন বিদেশি সরঞ্জাম স্থাপন করা হয়েছে। লাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, বোর্ডিং ব্রিজ, ব্যাগেজ বেল্টসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতির টেস্টিং ও কমিশনিংও সম্পন্ন হয়েছে।
সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের (বেবিচক) সাবস্টেশন প্রকৌশলী মো. সোহেল রানা বলেন, বছরে প্রায় ২০ লাখ যাত্রী পরিচালনার সক্ষমতা নিয়ে আন্তর্জাতিক প্যাসেঞ্জার টার্মিনালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। প্রয়োজনীয় বিদেশি সরঞ্জাম স্থাপনের পাশাপাশি বিভিন্ন যন্ত্রপাতির পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও সম্পন্ন হয়েছে। সোমবার থেকে যাত্রীসেবার জন্য টার্মিনালটি পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয়েছে।
কক্সবাজার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চালু হলে পর্যটনের পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও প্রভাব পড়তে পারে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি আবু মোরশেদ চৌধুরী খোকা বলেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম হয়ে বিদেশে পাঠানো শুঁটকি, সবজি ও অন্যান্য পণ্য কক্সবাজার থেকে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে সরাসরি পাঠানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের পাশাপাশি ট্রানজিট ও রিফুয়েলিং সুবিধা চালু করা গেলে রাজস্ব আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ জন্য দ্রুত কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, কার্গো ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিক সুবিধা ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কক্সবাজারের পর্যটন উদ্যোক্তা ও হোটেল ওশান প্যারাডাইসের পরিচালক আবদুল কাদের মিশু বলেন, অবকাঠামোর বড় অংশের কাজ শেষ হলেও আন্তর্জাতিক এয়ারলাইনগুলোর নিয়মিত ফ্লাইট ও পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করা একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। এই অবকাঠামো কক্সবাজারের পর্যটন, যোগাযোগ ও অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে, তা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল শুরুর পরই স্পষ্ট হবে।
কক্সবাজার বিমানবন্দরের পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মো. গোলাম মোর্তজা হোসেন বলেন, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনার জন্য বিমানবন্দর প্রস্তুত। পর্যাপ্ত জনবলও রয়েছে। সোমবার থেকে পরীক্ষামূলকভাবে টার্মিনাল চালু করা হয়েছে। রানওয়ে ও নতুন টার্মিনালের সব ব্যবস্থা ঠিকঠাক রয়েছে এবং আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের যাত্রীদের সেবা দিতে কোনো সমস্যা হবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
১০৯ বার পড়া হয়েছে