সর্বশেষ

জাতীয়

গড়াই নদী: নামের পরিচয় বদলানোর অধিকার কারও নেই

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৫৭ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার মানুষের কাছে গড়াই শুধু একটি জলধারা নয়; এটি জনপদ, কৃষি, সংস্কৃতি, নৌকা বাইচ, ভাঙন, জীবিকা ও স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি নদী। এর পরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত নাম “গড়াই নদী”। সরকারি কুষ্টিয়া জেলা পোর্টালেও নামটি গড়াই নদী হিসেবেই ব্যবহৃত, এবং একে পদ্মা তথা গঙ্গার প্রধান শাখানদী বলা হয়েছে। বাংলাপিডিয়াও “গড়াই–মধুমতী নদী” নামেই এ নদীকে চিহ্নিত করেছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে কিছু সংবাদমাধ্যম ও লেখায় “গড়াই নদ”, “গড়াই নদের পানি” বা “গড়াই নদে” ধরনের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো—গড়াইকে কেন “নদ” বানানো হচ্ছে? গড়াই কখনোই প্রতিষ্ঠিত নামে “নদ” ছিল না, আর কেবল সংস্কৃতঘেঁষা ব্যাকরণরীতির সুবিধার জন্য একটি নদীর ঐতিহাসিক ও স্থানীয় পরিচয় বদলে দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই।

ব্যাকরণের ছাঁচ, ভূগোলের সত্য নয়
সংস্কৃত ব্যাকরণে “নদ” শব্দটি পুংলিঙ্গ, আর “নদী” স্ত্রীলিঙ্গ হিসেবে চিহ্নিত। পুরোনো ব্যাকরণচর্চায় “নদ” থেকে “ঈ” প্রত্যয় যোগ করে “নদী” হওয়ার উদাহরণও দেওয়া হয়। কিন্তু এই ভাষাগত শ্রেণিবিন্যাস কোনো নদীর বাস্তব পরিচয় নির্ধারণ করে না। জলধারার শরীর, প্রবাহ, ইতিহাস বা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো লিঙ্গ নেই। গড়াইকে “নদ” বললে গড়াই পুরুষ হয়ে যায় না; আবার “নদী” বললে নারীও হয় না। এটি নিছক শব্দের ব্যাকরণগত কাঠামো।

সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন সেই কাঠামোকে মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকা নামের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। গড়াইয়ের স্থানীয় নাম “গড়াই নদী”—এ নাম বহু প্রজন্মের ব্যবহার, প্রশাসনিক পরিচিতি ও আঞ্চলিক স্মৃতির অংশ। সংবাদমাধ্যম যখন “নদী” বাদ দিয়ে “নদ” বসায়, তখন তারা কোনো নিরপেক্ষ বানান সংশোধন করছে না; বরং প্রচলিত পরিচয়কে বদলে একটি সংস্কৃতায়িত রূপে সাজাচ্ছে।

সব জলধারার ক্ষেত্রে একই ব্যাকরণিক ছাঁচ খাটে না। কপোতাক্ষের প্রতিষ্ঠিত নাম “কপোতাক্ষ নদ”—সাহিত্য, ইতিহাস ও জনব্যবহারে সেটি বহুল স্বীকৃত। কিন্তু সেই উদাহরণ টেনে গড়াইকে “নদ” বলার সুযোগ নেই। প্রতিটি নদীর নাম তার নিজস্ব ঐতিহাসিক ব্যবহার, স্থানীয় উচ্চারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নথির ভিত্তিতে বিবেচিত হওয়া উচিত।

এই ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ এবং দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা হবে স্থানীয় পরিচয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া। একটি সংবাদে লেখা উচিত—“কুষ্টিয়ার গড়াই নদীতে নৌকা বাইচ”, “গড়াই নদীর পানি বেড়েছে” বা “গড়াই নদী ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ”—কারণ এটাই পরিচিত, স্বীকৃত এবং বিভ্রান্তিহীন রূপ।

“নদ” না “নদী”—এই বিতর্ক কেবল একটি কারচিহ্নের প্রশ্ন নয়; এটি ভাষার ক্ষমতার প্রশ্ন। কেন্দ্রীয়, তৎসম এবং অভিজাত ভাষারীতি যদি স্থানীয় মানুষের মুখের ভাষা ও ভূগোলের পরিচয়কে সরিয়ে দেয়, তবে সেটি ভাষাগত আধিপত্যের লক্ষণ হয়ে ওঠে। কারও জন্মপরিচয় নিয়ে অভিযোগ না তুলেও বলা যায়: প্রতিষ্ঠিত স্থানীয় নামের বদলে সংস্কৃতঘেঁষা লিঙ্গভিত্তিক রূপ চাপিয়ে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় এবং বিভ্রান্তিকর।
গড়াই নদীই গড়াই নদী। তার নাম নিয়ে পরীক্ষানিরীক্ষা নয়, তার প্রবাহ, মানুষ ও ঐতিহ্য রক্ষাই হওয়া উচিত সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।

১২১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০