সর্বশেষ

সারাদেশ

বেনাপোলে রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে শতভাগ চালান পরীক্ষা

শেখ ফারহান‌ সাদাফ, বেনাপোল
শেখ ফারহান‌ সাদাফ, বেনাপোল

শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১০:৪৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
রাজস্ব ফাঁকি ও মিথ্যা ঘোষণা ঠেকাতে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে সন্দেহজনক পণ্যচালানের শতভাগ কায়িক পরীক্ষা জোরদার করা হয়েছে। কাস্টমসের আইআরএম (ইনটেনসিফায়েড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট) টিমের নজরদারি ও বিশেষ অভিযানে মিথ্যা ঘোষণা এবং ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির একাধিক ঘটনা ধরা পড়েছে। তবে অতিরিক্ত কড়াকড়ির কারণে বৈধ আমদানিকারকদের পণ্য খালাসে দেরি হচ্ছে বলে ব্যবসায়ীদের অভিযোগ। একটি চালান পরীক্ষা শেষ করতে তিন থেকে চার দিন পর্যন্ত সময় লাগছে বলেও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের অন্যতম প্রধান স্থলবন্দর বেনাপোল দিয়ে ভারতসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ পণ্য আমদানি হয়। আমদানি পণ্যের সঠিক ঘোষণা ও শুল্ক পরিশোধ নিশ্চিত করতে সম্প্রতি বেনাপোল কাস্টমস হাউসের আইআরএম টিমের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শনাক্ত হলে সেগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে।

কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে বেনাপোল কাস্টমস হাউসে প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হয়েছে। একই সময়ে মিথ্যা ঘোষণা ও ঘোষণাবহির্ভূত পণ্য আমদানির অভিযোগে ১৪টি চালান আটক করা হয়েছে। এসব ঘটনায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকির বিষয় শনাক্ত হয়েছে বলে কাস্টমসের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগে চারটি সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো লিংক ইন্টারন্যাশনাল, রয়েল এন্টারপ্রাইজ, করিম অ্যান্ড সন্স এবং হুদা ইন্টারন্যাশনাল।

কাস্টমস কর্মকর্তারা বলছেন, বন্ডের কাগজপত্র, তৈরি পোশাক ও রাসায়নিক পণ্যের চালানে অনিয়মের প্রবণতা তুলনামূলক বেশি দেখা যাচ্ছে। এসব চালানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে অতিরিক্ত যাচাই ও কায়িক পরীক্ষা করা হচ্ছে।

বেনাপোল কাস্টমস হাউসের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে সাম্প্রতিক সময়ে নিবিড় তদারকি, গোয়েন্দা তৎপরতা ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে রাজস্ব ফাঁকির বেশ কিছু চেষ্টা শনাক্ত করা হয়েছে বলে কাস্টমস সূত্র জানিয়েছে। কমিশনার মোহাম্মদ ফাইজুর রহমান, জয়েন্ট কমিশনার মো. শরফুদ্দিন মিঞা এবং আইআরএম টিমের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার তওফিকুর রহমানের নেতৃত্বে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

কাস্টমস কমিশনার ফাইজুর রহমান বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকির চেষ্টার বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নেওয়া হয়েছে। সন্দেহজনক চালান শতভাগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে ব্যবসায়ীদের একটি অংশের অভিযোগ, রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে গিয়ে বৈধ আমদানিকারকদেরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। তাঁদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ চালান কঠোরভাবে পরীক্ষা করার পাশাপাশি নিয়মিত ও বৈধ আমদানিকারকদের পণ্য দ্রুত খালাসের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।

বেনাপোল কাস্টমস সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট স্টাফ অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান বনি বলেন, আইআরএম টিম যেসব চালান পরীক্ষা করে, সেগুলো শতভাগ কায়িক পরীক্ষার পর খালাস দেওয়া হয়। তাঁর অভিযোগ, কিছু সাংবাদিক কাস্টমস ও বন্দর কর্মকর্তাদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের চেষ্টা করেন এবং তা না পেলে মিথ্যা ও বানোয়াট সংবাদ প্রকাশ করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

কাস্টমস কর্তৃপক্ষও কিছু গণমাধ্যমকর্মীর বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি, এমন কিছু প্রকাশনার কারণে কাস্টমস হাউসের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাজস্ব ফাঁকি ঠেকাতে কড়াকড়ির পাশাপাশি বেনাপোল দিয়ে পণ্য আমদানিতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। কাস্টমসের হিসাবে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে বেনাপোল দিয়ে ১৫ লাখ ৯১ হাজার ৬৭০ মেট্রিক টন পণ্য আমদানি হয়েছিল। আগের অর্থবছরের তুলনায় আমদানি কমেছিল ১ লাখ ২৯ হাজার ৭৯ মেট্রিক টন।

২০২৫–২৬ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের সংশোধিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৯০ কোটি টাকা। বছর শেষে আদায় হয়েছে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা। ফলে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ঘাটতি হয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪২ শতাংশ কম রাজস্ব আদায় হয়েছে। একই সময়ে বেনাপোল দিয়ে আমদানি প্রায় ১ লাখ ৯৭ হাজার মেট্রিক টন কমেছে।

রাজস্ব আদায় ও আমদানি কমে যাওয়ার পরও ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বেনাপোল কাস্টমস হাউসের জন্য ১০ হাজার ৫৮৮ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আগের অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা ৭০২ কোটি টাকা কম।

তবে গত অর্থবছরে ৬ হাজার ৫৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হওয়ায় নতুন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে আগের বছরের আদায়ের তুলনায় প্রায় ৪ হাজার ২৯ কোটি টাকা বেশি রাজস্ব আদায় করতে হবে।

রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে কঠোর নজরদারি এবং একই সঙ্গে বৈধ আমদানিকারকদের দ্রুত পণ্য খালাস—দুই বিষয়েই ভারসাম্য রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, ঝুঁকিপূর্ণ চালানে কঠোর পরীক্ষা অব্যাহত রেখে নিয়মিত আমদানিকারকদের ক্ষেত্রে দ্রুত ও স্বচ্ছ খালাসব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে রাজস্ব আদায় ও বাণিজ্য—দুই ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব।

১১৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন