সর্বশেষ

সারাদেশ

নওগাঁর মান্দায় খাল খননে হরিলুট: শ্রমিকদের ৫০ লাখ টাকা কার পকেটে?

মামুনুর রশীদ বাবু, নওগাঁ
মামুনুর রশীদ বাবু, নওগাঁ

মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট, ২০২৬ ৩:৩৪ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
নওগাঁর মান্দা উপজেলায় অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থানের জন্য বরাদ্দকৃত খালের টাকা হরিলুটের অভিযোগ উঠেছে। কাগজে-কলমে ২৫০ জন শ্রমিকের কাজ করার কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো শ্রমিকের হাতের স্পর্শ ছাড়াই যন্ত্র দিয়ে খনন করে প্রায় ৫০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তার যোগসাজশে এই অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

মান্দায় ২৫০ শ্রমিকের কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও প্রকল্প এলাকায় শ্রমিকের দেখা মেলেনি—তালিকায় স্বচ্ছল ব্যক্তি ও রাজনৈতিক কর্মীদের নাম থাকার অভিযোগ

নওগাঁর মান্দা উপজেলার কুসুম্বা ও ভারশো ইউনিয়নে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান এবং কৃষকের সুবিধার জন্য নেওয়া ১ কোটি ৮ লাখ টাকার খাল পুনঃখনন প্রকল্প ঘিরে উঠেছে নানা অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ। ৪০ দিন মেয়াদি এ প্রকল্পের কাজ শেষ হয়েছে প্রায় এক মাস আগে। প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন ১২৫ জন করে দুই ইউনিয়নে মোট ২৫০ জন অতি দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের কথা থাকলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, পুরো প্রকল্প চলাকালে খননকাজে কোনো শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি।

প্রকল্পটির আওতায় কুসুম্বা ইউনিয়নের হারকিশোর মৌজার বিল উথরাইল ব্রিজ থেকে বাদলঘাটা ব্রিজ পর্যন্ত এবং ভারশো ইউনিয়নের বাকাপুর মৌজার বাকাপুর দফাদার মোড় থেকে মেইন রোড হয়ে বিল উথরাইল পর্যন্ত মোট ৩ দশমিক ৬ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল পানি নিষ্কাশনের পথ সচল করা, জলাবদ্ধতা কমানো এবং অতি দরিদ্র মানুষের হাতে কর্মসংস্থান তুলে দেওয়া।

সরকারের অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি)-এর আওতায় নেওয়া প্রকল্পটিতে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ কোটি ৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে প্রায় ৫০ লাখ টাকা শ্রমিকদের মজুরির জন্য এবং অবশিষ্ট অর্থ এক্সকাভেটর পরিচালনা, বৃক্ষরোপণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যয়ের কথা ছিল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পে বাস্তবে কোনো শ্রমিক কাজ না করলেও কাগজে-কলমে ২৫০ জন শ্রমিককে প্রতিদিন কাজ করানো হয়েছে দেখানো হয়েছে। দুই ইউনিয়নে প্রতিদিন ১২৫ জন করে ২৫০ জন শ্রমিক হিসেবে ৪০ দিনে মোট ১০ হাজার শ্রমিক-দিন দেখানো হলেও মাত্র ৬১ জন শ্রমিককে অনুপস্থিত দেখিয়ে ৩০ হাজার ৫০০ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত দরিদ্র মানুষের পরিবর্তে শ্রমিকের তালিকায় ব্যবসায়ী, মুদি দোকানদার, সচ্ছল কৃষক এবং রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

এদিকে নওগাঁর অন্যান্য উপজেলায় খাল পুনঃখননের কাজ শেষে অব্যয়িত অর্থের বড় অংশ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হলেও মান্দায় ফেরত দেওয়া হয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা। এ কারণেই প্রকল্পের শ্রমিক তালিকা ও ব্যয়ের হিসাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে শুধু শ্রমিক তালিকাই নয়, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে খাল খননের অভিযোগও উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, খাল খননের আগে বাকাপুর ও ঘোনা ভারশো গ্রামের মোকলেসুর রহমান দেওয়ান, মো. হোসেন, অর্জুন কুমার, আনোয়ার হোসেন, খোকন, সুমন, শহিদুল ইসলাম, বেলাল হোসেন, আব্দুস সালাম, দুলাল হোসেন, মমতেজ আলী ও নাজমুল হোসেনসহ কয়েকজন অভিযোগ করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি। জমি অধিগ্রহণ না করেই ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির ওপর দিয়ে জোরপূর্বক খাল খনন করা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

কামারপুর গ্রামের বাসিন্দা প্রীতি রানী বলেন, খাল খননের কারণে তাঁর ৫৩ শতক জমি খালের মধ্যে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি বলে দাবি করেন তিনি।

ভারশো গ্রামের বাসিন্দা মোখলেসুর রহমান দেওয়ান বলেন, তিনি প্রতিদিন প্রকল্প এলাকার মধ্য দিয়ে যাতায়াত করেন। তাঁর দাবি, প্রকল্পের কাজ চলার এক মাসেরও বেশি সময়ে তিনি কোনো দিনমজুরকে খালের কাজে অংশ নিতে দেখেননি।

খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে কৃষক আনোয়ার হোসেন বলেন, খাল পুনঃখননের নামে বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, মান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফুল ইসলামের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও বিএনপি নেতা নওফেল আলী মন্ডলের নেতৃত্বে পাশের ভারশো ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সমর্থিত চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান সুমনসহ দুই ইউনিয়নের বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কিছু লোকজন মিলে প্রকল্পের অর্থ লুটপাট করেছেন।

তবে এ অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয় কৃষকদের আশঙ্কা, পরিকল্পিতভাবে খাল খনন না হলে উন্নয়নের পরিবর্তে তাদের কৃষিকাজে ক্ষতি হতে পারে। প্রয়োজনীয় বাঁধ ও পানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ছাড়া খাল গভীর করা হলে বর্ষার পানি জমিতে আটকে গিয়ে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতে পারে। এতে কয়েকটি গ্রামের শত শত কৃষক ক্ষতির মুখে পড়ার পাশাপাশি হাজার হাজার বিঘা জমি জলাবদ্ধতার ঝুঁকিতে পড়তে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি করা হয়েছে কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডলকে। কমিটিতে ভারশো ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানও রয়েছেন, যিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ছিলেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিকভাবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পরস্পরের প্রতিপক্ষ হলেও প্রকল্পের অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুই দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে সমঝোতা হয়েছে। স্থানীয়দের কেউ কেউ বিষয়টিকে ব্যঙ্গ করে বলছেন, ‘রাজনীতিতে যত বিভক্তি, প্রকল্পের টাকায় তত ঐক্য।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির এক নেতা বলেন, নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে খাওয়ার পাশাপাশি আওয়ামী লীগের লোকজনকেও সঙ্গে রাখা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও কুসুম্বা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নওফেল আলী মন্ডল এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি জানান, খাল খননে মোট চারটি এক্সকাভেটর ব্যবহার করা হয়েছে। তাঁর দাবি, ২৫০ জন শ্রমিকের তালিকা সঠিক ছিল এবং প্রতিদিন দুই ইউনিয়নের দু-একজন ছাড়া প্রায় সবাই কাজে উপস্থিত ছিলেন। তবে কয়েকজন সচ্ছল ব্যক্তির নাম ভুলবশত শ্রমিকের তালিকায় চলে যেতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি।

বিএনপি ও আওয়ামী লীগের নেতারা মিলে প্রকল্পের অর্থ লুটপাট করেছেন—এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেন নওফেল আলী মন্ডল। তাঁর ভাষ্য, পিআইও যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন, সেভাবেই প্রকল্পের কাজ করা হয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, খালের গভীরতা ১০ ফুট, তলদেশ ১২ ফুট, প্রস্থ ৩০ ফুট এবং দুই পাড়ে ছয় ফুট করে থাকার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্প এলাকায় বিভিন্ন স্থান ঘুরে এসব নকশার সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, অনেক জায়গায় খালের তলদেশ ও আশপাশের ফসলি জমির উচ্চতা প্রায় সমান। ফলে খাল পুনঃখননের পরও পানি নিষ্কাশনের কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে তাদের।

মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তাঁকে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতে হয়। খাল পুনঃখনন প্রকল্পের ‘অ্যাকুরেট’ তথ্য তাঁর কাছে নেই। এ বিষয়ে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে তথ্য নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।

মান্দা উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আরিফুল ইসলাম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

তিনি বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে সঠিকভাবে কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে এবং দিনমজুরদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, ৪০ দিন ধরে দুই ইউনিয়নে প্রতিদিন ১২৫ জন করে মোট ২৫০ জন অতি দরিদ্র শ্রমিক কাজ করেছেন। এ ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম হয়নি।

পিআইও জানান, ৪০ দিনে মোট ৬১ জন শ্রমিক অনুপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রতিদিনের ৫০০ টাকা মজুরি হিসেবে মোট ৩০ হাজার ৫০০ টাকা বেঁচে যায়, যা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।

নওগাঁর অন্যান্য উপজেলায় একই ধরনের খাল পুনঃখননের কাজ শেষে লাখ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হলেও মান্দায় কেন মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে—এ প্রশ্নের জবাবে পিআইও বলেন, অন্য উপজেলাগুলো হয়তো সঠিকভাবে কাজ করতে পারেনি। তারা শ্রমিকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে না পারায় বেশি অর্থ ফেরত দিতে পেরেছে।

তবে মো. আরিফুল ইসলামের দাবি, নওগাঁর ১১ উপজেলার মধ্যে একমাত্র মান্দা উপজেলাতেই সঠিকভাবে খাল পুনঃখনন করা হয়েছে এবং শতভাগ অতি দরিদ্র শ্রমিকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়েছে।

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাপাহার উপজেলা ছাড়া নওগাঁ জেলার ১০ উপজেলায় ১৩টি খাল পুনঃখননের জন্য মোট ৮ কোটি ৭০ লাখ ৩৯ হাজার ৩৯৭ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এর বিপরীতে প্রকৃত ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৩০ লাখ ৮৪ হাজার ৪১৫ টাকা।

খাল পুনঃখননের কাজ শেষে শতভাগ কাজ সম্পন্ন করার পরও বিভিন্ন উপজেলা অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দিয়েছে। এর মধ্যে নওগাঁ সদর উপজেলা ফেরত দিয়েছে ৪১ লাখ ৫০ হাজার টাকা, বদলগাছি ৪০ লাখ ৫০ হাজার, পোরশা ১২ লাখ ৮৯ হাজার, মহাদেবপুর ১২ লাখ ৫০ হাজার, নিয়ামতপুর ৯ লাখ ৮৩ হাজার, পত্নীতলা ৯ লাখ ১৭ হাজার, আত্রাই ৪ লাখ ৭৬ হাজার, রানীনগর ৪ লাখ ৬৭ হাজার এবং ধামইরহাট ৩ লাখ ৪৬ হাজার টাকা।

অন্যদিকে মান্দা উপজেলা ফেরত দিয়েছে মাত্র ৩০ হাজার ৫০০ টাকা।

ফলে দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থান, কৃষকের স্বার্থে পানি নিষ্কাশন এবং সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে নেওয়া ১ কোটি ৮ লাখ টাকার এই প্রকল্পে শ্রমিক তালিকা, বাস্তব কাজের পরিমাণ, ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি ব্যবহার এবং ব্যয়ের হিসাব নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ ও প্রশ্নের জবাব কতটা স্বচ্ছভাবে মিলবে—সেটিই এখন দেখার বিষয়।

১১৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন