২০২৪ এর ১৯ জুলাই: রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, ৯ দফা ঘোষণা ও আন্দোলনের নতুন মোড়
রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬ ৫:৪৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
জুলাই আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও সহিংস দিন ছিল ১৯ জুলাই ২০২৪। সারা দেশে টানা তৃতীয় দিনের মতো ইন্টারনেট বন্ধ থাকার মধ্যেই বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে অন্তত ৫৫ থেকে ৬৬ জন নিহত হওয়ার তথ্য উঠে আসে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে। একই দিনে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের অভিযোগ সামনে আসে। সরকারের আলোচনার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনকারীরা ঘোষণা করেন ৯ দফা দাবি, যা পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের রাজনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২০২৪ সালের ১৯ জুলাই ছিল ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির দ্বিতীয় দিন। ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ থাকলেও জুমার নামাজের পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছাত্র-জনতা বিক্ষোভে অংশ নেন। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ–সমর্থকদের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
সরকারিভাবে ওই দিনের হতাহতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ না হলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির গুলিতে সারা দেশে অন্তত ৫৫ থেকে ৬৬ জন নিহত হন। আহত হন শত শত মানুষ।
ঢাকার যাত্রাবাড়ী এলাকা ছিল সেদিনের সবচেয়ে সংঘর্ষপূর্ণ স্থানগুলোর একটি। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আব্দুল কাদের দাবি করেন, জুমার নামাজ শেষে মিছিল বের হওয়ার পরপরই গুলিবর্ষণ শুরু হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, অল্প সময়ের মধ্যেই কয়েকজন নিহত হন এবং ফ্লাইওভারের ওপর থেকেও আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়।
একই দিনে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে বিএনপি। কর্মসূচি থেকে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে আটক করা হয়। অন্যদিকে নয়াপল্টন ও পুরানা পল্টন এলাকায় ছাত্রদলের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে দলটির তিন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার তথ্য জানায় সংগঠনটি।
১৯ জুলাই আন্দোলন দমনে প্রথমবারের মতো হেলিকপ্টার ব্যবহারের অভিযোগও সামনে আসে। বসিলা ব্রিজ, মোহাম্মদপুর ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় আকাশপথ থেকে গুলিবর্ষণ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের অভিযোগ করেন আন্দোলনকারীরা। তাঁদের দাবি, এই ধরনের অভিযান পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অব্যাহত ছিল।
এ সময় সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, স্কুল-কলেজ ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরও আন্দোলনে অংশ নিতে দেখা যায়। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব এলেও তা প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলনের সমন্বয়কেরা ৯ দফা দাবি ঘোষণা করেন।
৯ দফা দাবির মধ্যে ছিল আন্দোলনে নিহতদের ঘটনায় দায় স্বীকার করে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়া, হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর পদত্যাগসহ বিভিন্ন বিষয়। আন্দোলনের নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ আলোচনার পর সর্বসম্মতিক্রমে এই দাবিগুলো চূড়ান্ত করা হয়।
ফ্যাসিবাদবিরোধী ছাত্রনেতাদের মতে, এই ৯ দফাই পরবর্তী সময়ে এক দফা দাবির ভিত্তি তৈরি করে এবং আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত গণআন্দোলনের দিকে নিয়ে যেতে ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, ১৯ জুলাই গভীর রাতে আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নূরকে আটক করে পুলিশ। একই রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশ রাজধানীতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। পাশাপাশি রাত ১২টা থেকে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৯ জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ শুধু সংঘর্ষের মাত্রাই বাড়ায়নি; একই সঙ্গে ৯ দফা ঘোষণার মাধ্যমে আন্দোলনের লক্ষ্য ও কৌশল আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পরবর্তী সময়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই দিনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৩৩ বার পড়া হয়েছে