বন্যা পরিস্থিতি: বিপর্যস্ত চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জে পানি কমলেও কাটেনি শঙ্কা
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬ ৫:১৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি এবং কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। কোথাও কোথাও পানি নামতে শুরু করলেও যোগাযোগ, বিদ্যুৎ, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট এখনও কাটেনি। একই সময়ে বেনাপোল স্থলবন্দরে জলাবদ্ধতায় কোটি টাকার আমদানিকৃত পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অন্যদিকে সুনামগঞ্জে নদ-নদীর পানি সামান্য কমলেও বন্যার আশঙ্কা এখনো রয়েছে।
টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি উপজেলা। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১৭৬টি ইউনিয়নের প্রায় ১ লাখ ৮৯ হাজার পরিবারের ৭ লাখ ৫৪ হাজারের বেশি মানুষ বন্যাকবলিত হয়েছেন। এ দুর্যোগে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু এবং ১০ জন আহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছে জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন বিভাগ।
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় প্রায় সব ইউনিয়ন ও পৌর এলাকার গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের ভাষ্য, পৌর এলাকায় পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলে নতুন করে পানি জমছে। ফলে অনেক এলাকায় দুর্ভোগ এখনও অব্যাহত রয়েছে।
সাঙ্গু নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় এবং ডলু নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন করে পানি ঢুকে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের কয়েকটি অংশ এখনো পানির নিচে থাকায় যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কিছু এলাকায় পানি কমলেও নৌকাই এখন প্রধান যাতায়াতের মাধ্যম। বহু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন থাকায় মোবাইল নেটওয়ার্কও অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে, ফলে দুর্গত এলাকার প্রকৃত তথ্য সংগ্রহেও প্রশাসনকে বেগ পেতে হচ্ছে।
বাঁশখালী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে পানি কমতে শুরু করলেও বহু মানুষ এখনো পানিবন্দি রয়েছেন। প্রশাসন বিভিন্ন স্থানে রাস্তা কেটে পানি সরানোর ব্যবস্থা করছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় প্রায় ৫৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন, যা আগের দিনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
বান্দরবানে বিচ্ছিন্ন জনপদ, ত্রাণ পৌঁছাতে চ্যালেঞ্জ
বান্দরবানে সাঙ্গু, মাতামুহুরী ও বাঁকখালী নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রশাসন, সেনাবাহিনী ও বিজিবি ত্রাণ বিতরণ করলেও দুর্গম কিছু এলাকায় এখনো প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
রাঙামাটিতে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, লংগদু, বরকল ও বিলাইছড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা অব্যাহত রয়েছে। বাঘাইছড়িতে পাহাড়ধসে কয়েক কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় খাগড়াছড়ি হয়ে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
খাগড়াছড়িতে পরিস্থিতির উন্নতি, কিছু এলাকা এখনো প্লাবিত
খাগড়াছড়িতে বৃষ্টি কমায় চেঙ্গী নদী ও আশপাশের খালের পানি নেমে গেছে। অধিকাংশ সড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হলেও ছোট মেরুং ইউনিয়নের হাজারো পরিবার এখনো পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।
কক্সবাজারে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের সংকট
কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া, রামুসহ বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে। পানি ধীরে ধীরে কমতে শুরু করলেও বহু এলাকায় বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যসংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বিতরণ চললেও স্থানীয়দের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় সহায়তা অপ্রতুল।
বেনাপোল বন্দরে জলাবদ্ধতায় ক্ষতির আশঙ্কা
একদিনের টানা বৃষ্টিতেই দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোলে বিভিন্ন শেডে হাঁটুপানি জমে যায়। এতে আমদানিকৃত বিপুল পরিমাণ পণ্য পানিতে ভিজে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিনের দুর্বল ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করছেন।
বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাম্পের মাধ্যমে পানি সরানোর কাজ চলছে এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সুনামগঞ্জে পানি কমলেও কাটেনি শঙ্কা
সুনামগঞ্জে গত ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি সামান্য কমেছে। তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বন্যার ঝুঁকি পুরোপুরি কাটেনি। সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে এবং একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ চালু রাখা হয়েছে।
এদিকে, চট্টগ্রামসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে প্রশাসনের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত থাকলেও দুর্গত মানুষের প্রধান চাহিদা এখন নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার এবং দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করা।
১৩১ বার পড়া হয়েছে