চট্টগ্রামে টানা বৃষ্টিতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা, ঢল ও জোয়ারে জনজীবন বিপর্যস্ত
মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬ ১০:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
টানা ভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের পানির উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের উপজেলাগুলোতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। এতে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায়ও ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।
চট্টগ্রামে চলমান ভারী বর্ষণে নগরের বিভিন্ন নিচু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ৩৩০ দশমিক ৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় বৃষ্টি হয়েছে ৬০ মিলিমিটার। একই সময়ে আমবাগান আবহাওয়া কেন্দ্র ২৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে।
ভারী বৃষ্টির সঙ্গে কর্ণফুলী নদীর জোয়ার ও পাহাড়ি ঢলের পানি যুক্ত হওয়ায় নগরের মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, চান্দগাঁও, মোহরা, পতেঙ্গার আকমল আলী সড়ক ও বড় দিঘির পাড়সহ বিভিন্ন এলাকা পানিতে ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমেছে।
জলাবদ্ধতার কারণে নগরের সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয়। গণপরিবহনের সংকটে অফিসগামী মানুষ ও শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে। অনেক রিকশাচালকের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
বৈরী আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে অর্ধবার্ষিক ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের অনেকে পানি মাড়িয়ে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছেছেন।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী-অক্সিজেন সড়কের বড়দিঘি পাড় এলাকায় জলাবদ্ধতার কারণে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পানিতে আটকে পড়ে বেশ কয়েকটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা বিকল হয়ে যায়। চিকনদণ্ডী ইউনিয়ন ভূমি অফিসেও পানি ঢুকে পড়ে। গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র ও সরঞ্জাম নিরাপদ রাখতে সেগুলো উঁচু স্থানে সরিয়ে রাখা হয়েছে।
এদিকে, প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট অবতরণ করতে পারেনি। বাতাসের গতি ঘণ্টায় ৮০ থেকে ৯০ কিলোমিটার থাকায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইনসের আবুধাবি-চট্টগ্রাম ও এয়ার আরাবিয়ার শারজাহ-চট্টগ্রাম ফ্লাইট ঢাকায় অবতরণ করে। বিমান বাংলাদেশের ঢাকা-চট্টগ্রাম ফ্লাইটও পুনরায় ঢাকায় ফিরে যায়। বেশির ভাগ ফ্লাইটের সময়সূচিতে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা পর্যন্ত বিলম্ব হয়েছে।
পাহাড়ধসের আশঙ্কায় চট্টগ্রাম মহানগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জেলা প্রশাসন। বিভিন্ন স্থানে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলায়ও ভারী বর্ষণের কারণে আমিরাবাদ, পুঁটিবিলা ও আধুনগরসহ কয়েকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি মনিটরিং সেল চালু করা হয়েছে এবং স্থানীয়ভাবে মাইকিং করা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে একাধিক বড় প্রকল্প চলমান থাকলেও এর সুফল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হওয়ায় জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৌশলী ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, চট্টগ্রামের ভৌগোলিক অবস্থান ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। শহরের অনেক খাল হারিয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারছে না।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) খাল উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে থাকলেও বর্ষার কারণে মাঠপর্যায়ের কিছু কাজ বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে অস্থায়ী বাঁধ সরানোর পর কাজ সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে।
তবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, আগাম নালা পরিষ্কার কার্যক্রম ও চলমান প্রকল্পের কারণে আগের তুলনায় জলাবদ্ধতা অনেক কমেছে।
১৩২ বার পড়া হয়েছে