কোমল মানুষের পৃথিবী ও কোরবানীর দর্শন
মঙ্গলবার, ২৬ মে, ২০২৬ ৩:৪১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমি মানুষকে ঘৃণা করতে শিখিনি। পৃথিবী আমাকে বহুবার শিখাতে চেয়েছে- কীভাবে প্রতিশোধ নিতে হয়। কীভাবে আঘাতের বদলে আরও গভীর আঘাত ফিরিয়ে দিতে হয়। কীভাবে মুখে হাসি রেখে অন্তরে বিষ লুকিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু আমি পারিনি। কারণ আমার ভেতরে এখনো এক ধরনের কোমলতা বেঁচে আছে। যা বারবার আহত হয়েও নিষ্ঠুর হতে শেখেনি।
যারা আমাকে পাথর ছুঁড়ে মেরেছে। আমি তাদের দিকেও ফুল ছুঁড়ে দিতে চেয়েছি। কারণ আমি জানি, মানুষ যখন অন্যকে আঘাত করে তখন তার ভেতরেও কোনো না কোনো ক্ষত জেগে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ংকর মানুষও কোনো একদিন হয়তো গভীরভাবে আহত হয়েছিল। তাই আমি মানুষের নিষ্ঠুরতার ভেতরেও তার ভাঙা বিচূর্ণতাকে খুঁজে ফিরি।
কিন্তু এই পৃথিবী কোমল মানুষের জন্য খুব সহজ জায়গা নয়। এখানে মানুষ এখন অনুভূতির চেয়ে অভিনয় বেশি করে। ভালোবাসার চেয়ে অহংকার বড় হয়ে উঠছে আর সম্পর্কের চেয়ে স্বার্থের মূল্য বেড়েছে। মানুষ আজ মানুষকে জয় করতে চায় কিন্তু বুঝতে চায় না। সবাই নিজের সত্য প্রমাণে ব্যস্ত কিন্তু কেউ কারও কান্নার ভাষা বোঝার সময় পায় না। এইসব ভাবনা সবচেয়ে বেশি এসে আমাকে ঘিরে ধরে কোরবানীর দিনগুলো কাছে এলে। চারপাশে তখন আনন্দের প্রস্তুতি, ব্যস্ততা, হাটের কোলাহল। কিন্তু সেই শব্দের মাঝেও আমি এক গভীর নীরবতা শুনতে পাই। মনে হয়, পৃথিবী যেন প্রতি বছর একই প্রশ্নের সামনে দাঁড়ায়। আমরা কি সত্যিই কোরবানীর অর্থ বুঝেছি?
কোরবানী তো শুধু রক্তের দৃশ্য নয়। কোরবানী মানে নিজের অহংকারকে জবাই করা। নিজের ভেতরের হিংসাকে কেটে ফেলা। যে ক্রোধ মানুষকে অমানবিক করে তোলে তাকে নিঃশব্দে হত্যা করা। অথচ আমরা অনেকেই পশু কোরবানী করি কিন্তু নিজের ভেতরের পশুটাকে বাঁচিয়ে রাখি। তাই পৃথিবীতে এত নামাজ আছে, এত ধর্মীয় আয়োজন আছে অথচ মায়া- মমতা ও মানবিকতা নাই বললেই চলে।
আমি যখন মানুষের মুখ দেখি, তখন বুঝতে পারি। অনেক কিছু বুঝতে পারি। অনেক মানুষ বাইরে থেকে খুব উজ্জ্বল কিন্তু ভেতরে ভীষণ ক্লান্ত। কেউ হয়তো সারাদিন হাসছে অথচ রাতে নিঃশব্দে কান্না লুকাচ্ছে। কেউ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, অথচ তার নিজের পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। এই নীরব মানুষগুলোর প্রতি আমার এক অদ্ভুত মমতা জন্মায়। কারণ আমি জানি, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর যুদ্ধগুলো অনেক সময় শব্দহীন হয়।
আমার কণ্ঠে যদি কখনো প্রতিবাদ ওঠে, সে প্রতিবাদ ঘৃণার নয়। আমি কাউকে ছোট করতে পছন্দ করি না। আমি শুধু মানুষকে তার হারিয়ে যাওয়া সৌন্দর্যের কথা মনে করিয়ে দিতে চাই। কারণ আমি বিশ্বাস করি মানুষ জন্মগতভাবে নিষ্ঠুর নয়। পৃথিবীর অন্ধকার তাকে ধীরে ধীরে কঠিন করে তোলে, নিষ্ঠুর করে তোলে। আর যে মানুষ বারবার আঘাত পেয়েও কোমল থাকতে পারে সে-ই প্রকৃত মানুষ।
আজ আমাদের সমাজে সবচেয়ে বড় অভাব জ্ঞানের নয়, সম্পদেরও নয় বরং অভাব হৃদয়ের। মানুষ এখন খুব সহজে অপমান করে, খুব সহজে সম্পর্ক ভেঙে ফেলে, খুব সহজে অন্যের কষ্টকে উপহাস করে। অথচ একটি কোমল বাক্য, একটি সহানুভূতির স্পর্শ, একটি নির্ভরতার হাত কারও পুরো জীবন বদলে দিতে পারে।
আমি কখনো শক্তির দম্ভে বিশ্বাস করিনি। কারণ শক্তি মানুষকে ভয় পাইয়ে দিতে পারে কিন্তু ভালোবাসা মানুষকে বদলে দিতে পারে। তাই আমি শব্দকে অস্ত্র বানাই না। আমি শব্দকে আয়না বানাতে চাই, যাতে মানুষ নিজের ভেতরের মুখ দেখতে পারে। যে মানুষ নিজের অন্ধকার দেখতে শেখে, সে একদিন আলোর প্রতিও আকৃষ্ট হয়।
এই কোরবানীতে আমি কাউকে আঘাত করার কথা বলতে চাই না। আমি শুধু চাই মানুষ একটু থামুক। নিজের ভেতরে তাকাক। যে ঘৃণাগুলো এতদিন বুকের মধ্যে জমিয়ে রেখেছে, সেগুলো নিঃশব্দে কোরবানী করুক। যে অহংকার মানুষকে মানুষ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় তাকে ত্যাগ করুক। কারণ আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না রক্তের রঙ, পৌঁছায় হৃদয়ের ত্যাগ।
কখনো কখনো সত্যিই খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয় এই পৃথিবী ধীরে ধীরে অনুভূতিহীন হয়ে যাচ্ছে। এখানে সরল মানুষগুলো বারবার আহত হয় আর কৌশলী বা ধপ্পাবাজ মানুষগুলো জয়ী হয়ে যায়। তবুও আমি আমার ভেতরের কোমলতাকে মেরে ফেলতে চাই না। কারণ আমি জানি নিজের আত্মাকে হারিয়ে ফেলার চেয়ে আহত হয়ে বেঁচে থাকা অনেক বেশি সম্মানের বা জৌলসের।
আমার ভেতরে এখনো এক শিশুর মতো বিশ্বাস বেঁচে আছে। একদিন মানুষ আবার মানুষের কাছে ফিরে আসবে। একদিন ঘৃণার চেয়ে মমতা বড় হবে। একদিন মানুষ ধর্মকে অহংকারের জন্য নয় বরং মানবতার জন্য ব্যবহার করবে। একদিন কেউ কারও কান্নাকে দুর্বলতা ভাববে না।
আর সেই দিনটির আশাতেই আমি চলছি। আহত হয়েও লিখি। নীরব থেকেও লিখি। কারণ আমি জানি পৃথিবী শেষ পর্যন্ত ধ্বংসের কাছে নয়, সৌন্দর্যের কাছেই পরাজিত হবে।
লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।
৩৯৯ বার পড়া হয়েছে