শ্যামনগরে নদীভাঙন প্রতিরোধ প্রকল্পে বাধা, অভিযোগ ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে
সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬ ১২:৪৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
সাতক্ষীরার শ্যামনগরে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন নদীভাঙন প্রতিরোধ ও বাঁধ সুরক্ষা প্রকল্পে বারবার বাধা প্রদান, চাঁদা দাবি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কাজ বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক ইউপি চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে।
একই ব্যক্তির বিরুদ্ধে পূর্বেও এমন অভিযোগ থাকায় এবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো) প্রকল্প পরিচালক জেলা প্রশাসকের কাছে বিস্তারিত লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
অভিযুক্ত ব্যক্তি হলেন শ্যামনগর উপজেলার ৯ নম্বর বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম। তিনি একই সঙ্গে শ্যামনগর উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ ও সুরা সদস্য বলেও উল্লেখ রয়েছে। তার বিরুদ্ধে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে হস্তক্ষেপ, কাজ বন্ধ করে দেওয়া, শ্রমিকদের ভয়ভীতি দেখানো, প্রকল্প কার্যালয়ে হামলার হুমকি, চাঁদা দাবি এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ আনা হয়েছে।
গত ১৩ মে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর পাঠানো একাধিক পৃষ্ঠার অভিযোগপত্রে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ‘দুর্যোগ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণ প্রকল্প (কম্পোনেন্ট-১, বাপাউবো অংশ)’–এর প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আরিফুজ্জামান ভূঁইয়া দাবি করেন, শ্যামনগরের খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা এবং বাঁধ সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বর্তমানে কার্যত হুমকির মুখে রয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন নদীতীর রক্ষায় প্রায় ৬০ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় পোল্ডার-৫ এলাকায় খোলপেটুয়া, মালঞ্চ ও কালিন্দী নদীর তীররক্ষা, স্লোপ প্রোটেকশন, জিওব্যাগ ডাম্পিং এবং সিসি ব্লক স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে ডিএল-উন্নয়ন (জেভি) এবং ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস লিমিটেডের পক্ষে আর-রাদ করপোরেশন। প্রকল্প এলাকার মধ্যে রয়েছে শ্যামনগরের পূর্ব দুর্গাবাটি, পশ্চিম দুর্গাবাটি, দাতিনাখালী ও ঝাপালি এলাকা।
অভিযোগে বলা হয়, প্রকল্প শুরুর পর থেকেই চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম বিভিন্নভাবে কাজ বন্ধের চাপ সৃষ্টি করেন। তিনি প্রকল্প এলাকায় গিয়ে দায়িত্বরত প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের হুমকি দেন, শ্রমিকদের ভয়ভীতি দেখান এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম সরাসরি প্রকল্প কার্যালয়ে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন এবং বড় অঙ্কের চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে প্রকল্প অফিস ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, যন্ত্রপাতি নষ্ট এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার হুমকিও দেন তিনি।
এরপর সেনাবাহিনী ক্যাম্প, জেলা প্রশাসন এবং শ্যামনগর থানায় একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও কার্যকর কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নদীভাঙন রোধে কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব ছিল না, কারণ বর্ষার আগে বাঁধ সুরক্ষা না হলে জোয়ারের পানিতে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তাই ঝুঁকি নিয়েই সীমিত আকারে জিওব্যাগ ডাম্পিং ও সিসি ব্লক তৈরির কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়।
আরও অভিযোগে বলা হয়, গত ১৪ এপ্রিল শ্যামনগরের পূর্ব দুর্গাবাটি এলাকায় প্রকল্প সাইটে গিয়ে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম, স্থানীয় কয়েকজন জামায়াত নেতাকর্মী এবং বহিরাগত লোকজন মানববন্ধনের নামে বিক্ষোভ করেন। এ সময় প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিক ও কর্মকর্তাদের মারধরের হুমকি দেওয়া হয়।
এ সময় স্কেভেটরের চালক ও সহকারীকে যন্ত্রের ভেতরে আটকে রেখে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে। পরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পুলিশের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ঘটনার পর থেকে শ্রমিকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং নিরাপত্তাহীনতায় অধিকাংশ শ্রমিক কাজ বন্ধ করে দেন। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
প্রকল্প বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান আর-রাদ করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সবুজ আলী খান অভিযোগ করেন, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকল্প পরিদর্শনে গেলে চেয়ারম্যানের পক্ষ থেকে তার কাছে ১২ লাখ টাকা কমিশন দাবি করা হয়। টাকা না দিলে কাজ বন্ধ, মানববন্ধন এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারের হুমকি দেওয়া হয় বলেও তিনি দাবি করেন।
তার ভাষায়, “চাঁদা না দেওয়ায় শ্রমিকদের কাজ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সাব-কন্ট্রাক্টরদেরও হুমকি দেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো প্রকল্প এখন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।”
এটি প্রথম অভিযোগ নয় বলেও জানা গেছে। গত ১৪ এপ্রিল শ্যামনগর থানায় দায়ের করা পৃথক আরেকটি অভিযোগে আর-রাদ করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা মো. জালাল উদ্দিন একই ধরনের অভিযোগ করেন।
সেই অভিযোগে বলা হয়, সিসি ব্লক তৈরির স্থান ও যন্ত্রপাতি রাখা সরকারি জমিতে কাজ চলাকালে চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম লোকজন নিয়ে এসে কাজ বন্ধ করে দেন এবং পরদিন ৩০ থেকে ৪০ জন লোক নিয়ে নির্মাণাধীন বাঁধ ভেঙে ফেলেন। এতে প্রায় ১০ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
তৎকালীন সময়ে শ্যামনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে অভিযোগ অস্বীকার করে বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাজী মো. নজরুল ইসলাম বলেন, সরকারি সামাজিক বনায়নের জায়গায় অবৈধভাবে ব্লক নির্মাণ করা হচ্ছিল। পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই তিনি বাধা দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি আরও বলেন, জমি সংক্রান্ত পূর্ববর্তী বিরোধের জের ধরেই তাকে হয়রানি করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক তার অভিযোগে উল্লেখ করেন, বর্ষা মৌসুমের আগেই কাজ শেষ না হলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙনের আশঙ্কা রয়েছে, যা জনবসতি, কৃষিজমি এবং উপকূলীয় বাঁধের জন্য মারাত্মক হুমকি তৈরি করবে।
তিনি আরও সতর্ক করেন, প্রকল্পটি জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়িত হওয়ায় সময়মতো কাজ শেষ না হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ অবস্থায় প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কাজের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
সাতক্ষীরার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম. রাজু আহমেদ বলেন, “নতুন পুলিশ সুপার যোগদান করেছেন। বিষয়টি আমরা এখনো অবগত নই। সরকারি কাজ বাস্তবায়নে জেলা পুলিশ সহযোগিতা করবে।”
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শেখ মঈনুল ইসলাম মঈন বলেন, “আমরা বিষয়টি অবগত হয়েছি। তবে এখনো অভিযোগের অফিসিয়াল কপি পাইনি। পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
১২১ বার পড়া হয়েছে