সর্বশেষ

জাতীয়

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে হত্যা মামলা ও হয়রানির শিকার সাংবাদিকরা

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬ ৮:২১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের সংবাদমাধ্যম অঙ্গনে এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, সাংবাদিক সংগঠন ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—দেশজুড়ে বহু সাংবাদিক হত্যা, হত্যাচেষ্টা ও নাশকতার মামলায় আসামি হচ্ছেন। একই সঙ্গে হামলা, গ্রেপ্তার, চাকরিচ্যুতি ও নানা ধরনের হয়রানির অভিযোগও ক্রমশ বাড়ছে।

অভিযোগ রয়েছে, যেসব সাংবাদিক আন্দোলনের উত্তাল সময়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে মাঠপর্যায়ে থেকে সংবাদ সংগ্রহ করেছেন, তাঁদেরই একটি অংশ এখন বিভিন্ন মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ চাকরি হারিয়েছেন, কেউবা পেশাগত ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।

বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংবাদিক সংগঠনের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত অন্তত কয়েকশ সাংবাদিক বিভিন্ন মামলায় জড়িয়ে পড়েছেন।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ)-এর তথ্য অনুযায়ী, এই সময়ে অন্তত ৮১৪ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হামলা ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৫৮৫ জন সরাসরি হামলার শিকার, ১৭৪ জন হত্যা মামলার আসামি, ১২ জন হত্যাচেষ্টা মামলার আসামি, ৩৭ জন নাশকতা মামলার আসামি এবং ৬ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। সংগঠনটির তথ্যে আরও বলা হয়, ২০২৫ সালেই সবচেয়ে বেশি ৬২২ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হন।

অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ মাসে ৪২৭টি হামলার ঘটনায় ৮৩৪ জন সাংবাদিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৩৭৯ জন আহত এবং ৩৩ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) জানিয়েছে, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে ৪৯৬ জন সাংবাদিক হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং ১৮৯ জন চাকরি হারিয়েছেন।

আইন বিশেষজ্ঞ ও সাংবাদিক নেতারা বলছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সংবাদমাধ্যমকে ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই স্তম্ভকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই আদালতে প্রমাণ করা কঠিন হবে। এর ফলে প্রকৃত ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, “স্বৈরাচারের দোসর” ট্যাগ ব্যবহার করে সাংবাদিকদের হয়রানি করা হচ্ছে বলে যে অভিযোগ উঠছে, বাংলাদেশের আইনে এ ধরনের কোনো নির্দিষ্ট অপরাধের সংজ্ঞা নেই। ফলে বিষয়টি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আরও বলেন, ভবিষ্যতে যেসব সাংবাদিক নিজেদের বিরুদ্ধে অন্যায় বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা মনে করবেন, তাঁরা আইনি প্রতিকার চাইতে পারবেন।

প্রতিবেদনে এমন একাধিক ঘটনার উল্লেখ রয়েছে, যেখানে নিহত ব্যক্তির পরিবারের অজ্ঞাতে কিংবা দূর সম্পর্কের সূত্র ধরে সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

কুড়িগ্রামে এক তরুণের মৃত্যুর ঘটনায় স্থানীয় কয়েকজন সাংবাদিককে আসামি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে লালমনিরহাট, রংপুরসহ বিভিন্ন জেলায়। কোথাও কোথাও মামলা বাণিজ্য ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগও সামনে এসেছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, কিছু ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরাও জানেন না কীভাবে মামলা দায়ের করা হয়েছে বা কেন সাংবাদিকদের আসামি করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে সম্পাদক পরিষদের নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মাহফুজ আনাম বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থানের পর মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো থেকে পরিত্রাণের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, এই মামলাগুলো আমাদের সময়ে হয়নি। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া গেছে। হত্যা মামলাগুলো রিভিউ করা হবে। হয়রানিমূলক মামলাগুলো ফরমালি প্রত্যাহার করা হবে।”

সাংবাদিক নেতা ও সংবাদপত্র মালিক সমিতির সভাপতি মতিউর রহমান চৌধুরী বলেন, “আমরা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ২৮২ জন সাংবাদিকের তালিকা দিয়েছি, যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৪ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তিনি বলেছেন, এসব মামলা রিভিউ করা হবে এবং হয়রানিমূলক মামলাগুলো প্রত্যাহার করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আমাদের বলেছেন, গত তিন মাসে কোনো সাংবাদিক নিগৃহীত হয়নি। সাংবাদিকদের বিষয়গুলো তিনি খেয়াল রাখবেন।”

তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মামলায় অভিযুক্ত সাংবাদিকদের বিষয়টি প্রতিকারের জন্য প্রধানমন্ত্রী আগেই নির্দেশ দিয়েছেন।

যদিও সরকারিভাবে মামলাগুলো পুনর্বিবেচনার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, মাঠপর্যায়ে সাংবাদিকদের হয়রানি অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

দেশের বিভিন্ন জেলায় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বহু সাংবাদিক এখনো হত্যা ও নাশকতা মামলার আসামি হয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। কেউ চাকরি হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন, আবার কেউ নিয়মিত আইনি ও সামাজিক চাপের মুখে রয়েছেন।

কিছু সাংবাদিকের দাবি, ঘটনার সময় তাঁরা ঘটনাস্থলেই ছিলেন না। তবুও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কারণে তাঁদের মামলায় জড়ানো হয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া এসব মামলা ও হয়রানির অভিযোগ এখন দেশজুড়ে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। একদিকে বিচার ও তদন্ত প্রক্রিয়া, অন্যদিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

১৩৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন