নারীদের বন্ধ্যত্বের ৬ সম্ভাব্য লক্ষণসমূহ
বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৪৯ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
নারীদের গর্ভধারণে সমস্যা হওয়ার পেছনে হরমোনের ভারসাম্যহীনতা, ডিম্বস্ফোটনের জটিলতা, এন্ডোমেট্রিওসিসসহ বিভিন্ন শারীরিক কারণ থাকতে পারে। অনিয়মিত মাসিক, সহবাসের সময় ব্যথা কিংবা অস্বাভাবিক যোনিস্রাবের মতো কিছু পরিবর্তন প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। তবে এসব লক্ষণ থাকলেই বন্ধ্যত্ব হয়েছে, এমন নয়। আবার কোনো উপসর্গ ছাড়াও গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। তাই লক্ষণগুলো সম্পর্কে সচেতন থাকা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
বিশ্বজুড়ে বহু নারী বন্ধ্যত্বের সমস্যার মুখোমুখি হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, প্রজননক্ষম বয়সী প্রতি ছয়জনের মধ্যে প্রায় একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বন্ধ্যত্বের সমস্যায় ভোগেন।
সাধারণভাবে নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও ১২ মাসের মধ্যে গর্ভধারণ না হলে তাকে বন্ধ্যত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে নারীর বয়স, শারীরিক অবস্থা ও প্রজননস্বাস্থ্যের ইতিহাস অনুযায়ী এর আগেও চিকিৎসকেরা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম (পিসিওএস), এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ু বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যা এবং হরমোনের ভারসাম্যহীনতা গর্ভধারণে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু শারীরিক পরিবর্তন প্রজননস্বাস্থ্যের সমস্যার সম্ভাব্য ইঙ্গিত দিলেও শুধু লক্ষণ দেখে বন্ধ্যত্ব নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
নারীদের বন্ধ্যত্বের ৬টি সম্ভাব্য লক্ষণ
১. অনিয়মিত মাসিক বা মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া
মাসিক চক্র অনিয়মিত হওয়া ডিম্বস্ফোটনের সমস্যার ইঙ্গিত দিতে পারে। সাধারণত মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হয়ে থাকে। তবে ব্যক্তিভেদে কিছুটা পার্থক্য থাকতে পারে।
মাসিকের ব্যবধান বারবার অস্বাভাবিক হওয়া, দীর্ঘদিন মাসিক না হওয়া কিংবা বছরে খুব কমবার মাসিক হওয়ার পেছনে হরমোনজনিত সমস্যা থাকতে পারে। পিসিওএস, থাইরয়েডের সমস্যা, অতিরিক্ত ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া এর সম্ভাব্য কারণ।
ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত না হলে গর্ভধারণের সম্ভাবনা কমতে পারে। তাই দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত থাকলে বা বন্ধ হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
২. সহবাসের সময় বা পরে ব্যথা
সহবাসের সময় কিংবা পরে বারবার ব্যথা অনুভব করলে বিষয়টি অবহেলা করা ঠিক নয়। বিশেষ করে ব্যথার সঙ্গে মাসিকের সময় তীব্র যন্ত্রণা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এন্ডোমেট্রিওসিস, শ্রোণি অঞ্চলের প্রদাহজনিত রোগ এবং প্রজনন অঙ্গের কিছু সমস্যার কারণে এমন ব্যথা হতে পারে। এসব অবস্থার কোনো কোনোটি গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি করতে পারে। তবে সহবাসে ব্যথা হলেই বন্ধ্যত্ব রয়েছে, এমন নয়। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
৩. হরমোনের ভারসাম্যহীনতার লক্ষণ
হরমোনের পরিবর্তন মাসিক চক্র ও ডিম্বস্ফোটনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এর কিছু সম্ভাব্য লক্ষণ হলো—
মুখে বা শরীরে অতিরিক্ত লোম গজানো
ব্রণ বেড়ে যাওয়া
অস্বাভাবিকভাবে ওজন বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া
মাসিক অনিয়মিত হওয়া
মাথার চুল পাতলা হয়ে যাওয়া
পিসিওএস, থাইরয়েডের সমস্যা ও অন্যান্য হরমোনজনিত অসুস্থতার কারণে এসব পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত লোম গজানো বা ব্রণের সমস্যা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। শুধু এসব লক্ষণ দেখে অবশ্য কোনো রোগ নিশ্চিত করা যায় না।
৪. তলপেট বা শ্রোণি অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
তলপেট বা শ্রোণি অঞ্চলে দীর্ঘদিন ব্যথা থাকা, মাসিকের সময় তীব্র যন্ত্রণা হওয়া কিংবা ব্যথার কারণে দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হওয়া প্রজনন অঙ্গের সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।
এন্ডোমেট্রিওসিস, জরায়ুর ফাইব্রয়েড এবং শ্রোণি অঞ্চলের প্রদাহজনিত রোগ এ ধরনের ব্যথার সম্ভাব্য কারণ। এন্ডোমেট্রিওসিসের কারণে প্রজনন অঙ্গের আশপাশে প্রদাহ বা আঠালো টিস্যু তৈরি হতে পারে। আবার সংক্রমণের কারণে ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হলে গর্ভধারণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।
তবে সব ধরনের তলপেটের ব্যথার সঙ্গে বন্ধ্যত্বের সম্পর্ক নেই। ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়লে কিংবা জ্বরের সঙ্গে দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
৫. অতিরিক্ত ওজন বা অস্বাভাবিকভাবে ওজন কমে যাওয়া
শরীরের ওজন ও পুষ্টির অবস্থা হরমোনের ভারসাম্য এবং ডিম্বস্ফোটনকে প্রভাবিত করতে পারে। অতিরিক্ত ওজনের সঙ্গে পিসিওএস ও ডিম্বস্ফোটনের সমস্যার সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত কম ওজন, অপুষ্টি বা কঠোর ব্যায়ামের কারণে শরীরে পর্যাপ্ত শক্তির ঘাটতি তৈরি হলেও মাসিক অনিয়মিত হতে পারে।
এর ফলে মাসিক চক্রে পরিবর্তন, ডিম্বস্ফোটনে অনিয়ম এবং গর্ভধারণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে। তবে ওজন বেশি হলেই বন্ধ্যত্ব হবে বা ওজন কম হলেই প্রজননক্ষমতা কমে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। ওজনের পরিবর্তনের সঙ্গে মাসিকের অনিয়ম দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৬. অস্বাভাবিক যোনিস্রাব বা বারবার সংক্রমণ
মাসিক চক্র অনুযায়ী যোনিস্রাবের পরিমাণ ও ধরনে স্বাভাবিক পরিবর্তন হতে পারে। তবে স্রাবে দুর্গন্ধ, অস্বাভাবিক রং, চুলকানি, জ্বালাপোড়া কিংবা তলপেটে ব্যথা থাকলে সংক্রমণের সম্ভাবনা বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ ও যৌনবাহিত সংক্রমণের কারণে এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ক্ল্যামাইডিয়া বা গনোরিয়ার মতো কিছু যৌনবাহিত সংক্রমণের চিকিৎসা না করালে শ্রোণি অঞ্চলে প্রদাহ সৃষ্টি হতে পারে। এতে ফ্যালোপিয়ান টিউব ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে গর্ভধারণে সমস্যা এবং জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে সাধারণ যোনিস্রাব বা সব ধরনের যোনিপথের সংক্রমণ বন্ধ্যত্বের কারণ নয়। অস্বাভাবিক স্রাব দেখা দিলে পরীক্ষা করিয়ে কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
গর্ভধারণে সমস্যা হলে কত দিন অপেক্ষা করা উচিত, তা নারীর বয়স ও শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
৩৫ বছরের কম বয়স: নিয়মিত অসুরক্ষিত যৌনসম্পর্কের পরও ১২ মাসে গর্ভধারণ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩৫ থেকে ৪০ বছর বয়স: ছয় মাস চেষ্টা করার পরও গর্ভধারণ না হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো প্রয়োজন।
৪০ বছরের বেশি বয়স: গর্ভধারণের পরিকল্পনা থাকলে শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বয়স নির্বিশেষে: মাসিক বন্ধ থাকা, দীর্ঘদিন অনিয়মিত মাসিক, এন্ডোমেট্রিওসিস বা ফ্যালোপিয়ান টিউবের সমস্যার ইতিহাস থাকলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
চিকিৎসক প্রয়োজন অনুযায়ী প্রজননস্বাস্থ্যের ইতিহাস পর্যালোচনা, শারীরিক পরীক্ষা, আলট্রাসনোগ্রাম ও হরমোন পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন। প্রয়োজনে ফ্যালোপিয়ান টিউবের অবস্থা এবং সঙ্গীর শুক্রাণুর মানও পরীক্ষা করা হয়।
প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে করণীয়
সব ধরনের বন্ধ্যত্ব প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে কিছু অভ্যাস প্রজননস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সহায়ক হতে পারে।
সুষম খাবার গ্রহণ ও স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা।
ধূমপান এড়িয়ে চলা।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া হরমোন বা প্রজননক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ গ্রহণ না করা।
যৌনবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ যৌনাচরণ অনুসরণ করা।
মাসিকের তারিখ, ব্যথা ও অস্বাভাবিক শারীরিক পরিবর্তনের দিকে খেয়াল রাখা।
গর্ভধারণে সমস্যা হলে নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করানো।
মনে রাখতে হবে, অনিয়মিত মাসিক, সহবাসে ব্যথা, হরমোনের পরিবর্তন বা অস্বাভাবিক যোনিস্রাব মানেই বন্ধ্যত্ব নয়। আবার কোনো লক্ষণ না থাকলেও গর্ভধারণে সমস্যা হতে পারে। তাই অনুমানের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত না নিয়ে সঠিক সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং সমস্যার কারণ নির্ণয় করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণ করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
১১০ বার পড়া হয়েছে