ভিক্ষুক আম্বিয়ার মানবিকতা: বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সোহানার দায়িত্ব নিলেন নরসিংদীর ডিসি
রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬ ১:০৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সাত বছরের শিশু সোহানা। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না সে। প্রায় পাঁচ বছর আগে মা-বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পর থেকে শিশুটিকে নিজের কাছে রেখে যত্ন করছেন ষাটোর্ধ্ব আম্বিয়া বেগম। নরসিংদী শহরের বানিয়াছল এলাকায় ড্রেনের পাশে সোহানার পড়ে থাকার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আলোচনায় আসে। এবার শিশুটির চিকিৎসা, আইনগত পরিচয় ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে নরসিংদী জেলা প্রশাসন।
শৈশবের যে সময়ে একটি শিশুর হাসি-খেলায় মেতে ওঠার কথা, পরিবারের স্নেহ-ভালোবাসায় বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সেই অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটছে সোহানার। জন্মগতভাবে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন হওয়ায় সে ঠিকমতো হাঁটতে পারে না। নিজের প্রয়োজন ও কষ্টের কথাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে পারে না। তবু আধো স্বরে মা-বাবাকে ডাকে সে। কিন্তু সেই ডাকে সাড়া দেওয়ার মতো আপনজন তার পাশে নেই।
নরসিংদী রেলস্টেশনসংলগ্ন বানিয়াছল এলাকায় শিশুটির এমন অসহায় অবস্থার খবর সামনে আসার পর তার পাশে দাঁড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে নিজের অভাব-অনটনের মধ্যেও সোহানাকে আগলে রেখেছেন আম্বিয়া বেগম নামের এক নারী। তাঁর নিজেরই যেখানে দুবেলা খাবার জোগাড় করা কঠিন, সেখানে শিশুটির খাবার ও যত্নের ব্যবস্থা করতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন তিনি।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া বানিয়াছল এলাকায় সোহানাকে দেখতে যান। এ সময় তিনি শিশুটির বর্তমান অবস্থা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষার বিষয়ে খোঁজখবর নেন।
জেলা প্রশাসকের নির্দেশনায় সোহানার প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি হিসেবে সুবর্ণ নাগরিক কার্ড তৈরি এবং জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ সময় শিশুটির হাতে নতুন পোশাক, খাবার ও শুকনো খাদ্যসামগ্রী তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি সোহানার প্রাথমিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জেলা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসনের এসব উদ্যোগের মাধ্যমে শিশুটিকে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার পাশাপাশি তার আইনগত পরিচয় ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ তৈরি হবে। তবে সোহানার জন্য দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ আবাসন, নিয়মিত চিকিৎসা, উপযুক্ত পরিচর্যা এবং শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও জরুরি।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক), নরসিংদী সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি), শহর সমাজসেবা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা।
সোহানার মা-বাবা ও অভিভাবকদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। তাঁদের দায়িত্ব পালনে অবহেলা কিংবা শিশুটিকে পরিত্যাগের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া।
শিশুটির মা-বাবা দায়িত্ব নিতে অস্বীকৃতি জানালে কিংবা তাঁদের কাছে নিরাপদে বেড়ে ওঠার পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সোহানার সুরক্ষা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে সরকারি শিশু পরিবারে ভর্তির বিষয়টিও বিবেচনা করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
সোহানার জীবনে আম্বিয়া বেগমের ভূমিকা এখন আলোচনায় এসেছে। নিজের আর্থিক সংকট ও শারীরিক অসুস্থতার মধ্যেও তিনি শিশুটিকে আগলে রেখেছেন। ভিক্ষা করে পাওয়া সামান্য অর্থ দিয়ে সোহানার খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও শিশুটির প্রতি তাঁর এই মমতা মানবিকতার একটি দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।
আম্বিয়া বেগম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি নরসিংদী শহরে বসবাস করছেন। অন্যের বাড়িতে কাজ করার পাশাপাশি ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় পাঁচ বছর আগে সাগর-লিজা দম্পতি ওই এলাকায় বসবাস করতেন। দাম্পত্য কলহ ও অভাব-অনটনের কারণে তাঁরা বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুটিকে রেখে চলে যান। এরপর থেকে সোহানা তাঁর কাছেই রয়েছে। ওই দম্পতি বর্তমানে কোথায় আছেন, তা তিনি জানেন না।
আম্বিয়া বেগম আরও জানান, সম্প্রতি প্রতিবেশী শিশুদের সঙ্গে থাকার সময় সোহানা ড্রেনের পাশে পড়ে যায়। সেই ঘটনার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে শিশুটির দুরবস্থা এবং তাকে আগলে রাখা আম্বিয়া বেগমের বিষয়টি সামনে আসে।
স্থানীয় মানুষের প্রশংসা পেলেও শিশুটির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এখন চরম সংকটে রয়েছেন এই ষাটোর্ধ্ব নারী। বয়সের ভার, অসুস্থতা ও দারিদ্র্যের কারণে তাঁর পক্ষে একা সোহানার প্রয়োজনীয় যত্ন নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে তিনি সহযোগিতা চেয়েছেন।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান কেয়া আম্বিয়া বেগমের মানবিক ভূমিকার প্রশংসা করে তাঁকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “আম্বিয়া বেগমরাই আমাদের সত্যিকারের বাংলাদেশ। তাঁদের মতো মানুষই আমাদের ভালো কাজ করার জন্য প্রতিনিয়ত অনুপ্রেরণা জোগায়।”
নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও অন্য একটি শিশুর দায়িত্ব নেওয়ার মাধ্যমে আম্বিয়া বেগম যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তা সমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে। একই সঙ্গে তাঁর মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোও প্রয়োজন, যাতে তাঁরা নিজেদের সংকটের মধ্যেও অন্যের সহায়তায় যে ভূমিকা রাখছেন, তার যথাযথ মূল্যায়ন হয়।
সোহানার পাশে জেলা প্রশাসনের দাঁড়ানো শিশুটির জীবনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এই উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। তার চিকিৎসা, জন্মনিবন্ধন, সুবর্ণ নাগরিক কার্ড, নিরাপদ আবাসন এবং নিয়মিত পরিচর্যার ব্যবস্থা কতটা কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।
এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও জনপ্রতিনিধিদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের অধিকার সম্পর্কে পরিবার ও সমাজের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।
একটি শিশুকে নিরাপদ আশ্রয় দেওয়া মানে শুধু তাকে তাৎক্ষণিক বিপদ থেকে রক্ষা করা নয়; বরং তার পরিচয়, মর্যাদা, চিকিৎসা ও ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্ব নেওয়া। সোহানার জন্য শুরু হওয়া এই উদ্যোগ যেন দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষায় রূপ নেয়, সেটিই এখন প্রত্যাশা।
১২১ বার পড়া হয়েছে