সর্বশেষ

সারাদেশ

ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় তরুণদের উদ্যোগ

চরমপন্থীদের উপেক্ষা করে আমবাড়িয়ায় ‘৮৮ এর ‘মডেল নির্বাচন’

মুন্সী তরিকুল ইসলাম
মুন্সী তরিকুল ইসলাম

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৬ ৭:১১ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়নে ১৯৮৮ সালে চরমপন্থী সন্ত্রাস ও ভয়ভীতির পরিবেশ উপেক্ষা করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছিলেন স্থানীয় শিক্ষিত তরুণেরা। আমবাড়িয়া সমাজ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত এক সমাবেশে ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের মানুষ ও নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন। তৎকালীন বুয়েটের শিক্ষার্থী এবং পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী শামসুল আলমের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ওই সমাবেশে সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশে ভোট গ্রহণ এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তের পক্ষে অঙ্গীকার করা হয়।
১৯৮৮ সালে আমবাড়িয়া সমাজ কল্যাণ সমিতি আয়োজিত ইউপি নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে শান্তিপূর্ণ, সুষ্ঠু করার বার্তা ছড়িয়ে দিতে বক্তব্য দেন তরুণ প্রকৌশলী শামসুল আলম

একসময় কুষ্টিয়ার জনপদজুড়ে ছিল চরমপন্থী সন্ত্রাসের ভয়াবহ দাপট। আশি ও নব্বইয়ের দশকে আতঙ্ক, হত্যা, ভয়ভীতি আর অস্ত্রের ঝনঝনানিতে বিপর্যস্ত ছিল সাধারণ মানুষের জীবন। রাজনীতি থেকে ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক কর্মকাণ্ড থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন—কোনো কিছুই ছিল না সন্ত্রাসীদের প্রভাবমুক্ত। কোথাও কোথাও ভোটের মাঠেও নির্ধারক হয়ে উঠত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ইচ্ছা ও নির্দেশনা। এমন এক ভয়ংকর বাস্তবতায় কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়িয়া ইউনিয়নে ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত হয়েছিল এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। স্থানীয় শিক্ষিত মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অবাধ ও সুষ্ঠু ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত হয়েছিল একটি সচেতনতামূলক সমাবেশ। স্থানীয়ভাবে যা ছিল সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার এক সাহসী প্রয়াস।

আমবাড়িয়া সমাজ কল্যাণ সমিতির উদ্যোগে আয়োজিত সেই সমাবেশের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন এলাকার কৃতিসন্তান শামসুল আলম। তৎকালীন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) মেধাবী ছাত্র শামসুল আলম পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎ খাতের একজন সফল প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিতি অর্জন করেন। তিনি পিডিবির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনি পশ্চিমাঞ্চল বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি (ওজোপাডিকো) লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর উদ্যোগে আমবাড়িয়ায় ভোটাধিকার ও সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচনের পক্ষে যে সামাজিক অবস্থান তৈরি হয়েছিল, তা আজও স্থানীয় ইতিহাসের একটি স্মরণীয় অধ্যায় হিসেবে উঠে আসে।

সন্ত্রাসের ছায়ায় বিপন্ন ছিল জনজীবনঃ
কুষ্টিয়া অঞ্চলের আশি ও নব্বইয়ের দশকের ইতিহাসে চরমপন্থী-সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ এক গভীর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। বিভিন্ন নিষিদ্ধ ঘোষিত সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় জনজীবনে তৈরি হয়েছিল দীর্ঘস্থায়ী আতঙ্ক। অনেক এলাকায় সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবনযাপন পর্যন্ত বাধাগ্রস্ত হয়েছিল।

স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর দ্বন্দ্ব ও সংঘাতের মধ্যে সাধারণ মানুষ প্রায়ই অসহায় হয়ে পড়তেন। অভিযোগ রয়েছে, কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয় নির্বাচনেও প্রার্থী নির্ধারণ, প্রচারণা এবং ভোটের ফলাফলে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করত সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ফলে নির্বাচন কেবল জনপ্রতিনিধি বেছে নেওয়ার গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া না থেকে অনেক সময় ভয়ভীতি ও প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় পরিণত হতো।

সেই সময় মিরপুর তথা কুষ্টিয়ার আশপাশের এলাকায় আলোচিত বিভিন্ন চরমপন্থী গ্রুপের নামও আতঙ্কের সঙ্গে উচ্চারিত হতো। এদের নেতৃত্বাধীন বাহিনীকে ঘিরে হত্যা ও সহিংসতার নানা অভিযোগ প্রচলিত ছিল। এমন পরিবেশে সাধারণ মানুষের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ।

বটগাছের নিচে গণতন্ত্রের পক্ষে শপথঃ
এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতেই ১৯৮৮ সালে আমবাড়িয়া ইউনিয়নে একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেয় আমবাড়িয়া সমাজ কল্যাণ সমিতি। তখনকার আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান ও সদস্য পদপ্রার্থীদের প্রতি সম্মান ও শুভেচ্ছা জানানো এবং নির্বাচনকে শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু করার বার্তা ছড়িয়ে দিতে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি সমাবেশের আয়োজন করা হয়।

বিদ্যালয়ের মাঠে বটগাছের নিচে অনুষ্ঠিত সেই সভায় আমবাড়িয়া ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের মানুষ অংশ নেন। উপস্থিত ছিলেন এলাকার শিক্ষিত ব্যক্তিবর্গ, সমিতির উপদেষ্টা, স্থানীয় নেতৃবৃন্দ এবং নির্বাচনের প্রার্থীরা। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্থানীয়ভাবে শ্রদ্ধেয় অধ্যক্ষ আবেদ স্যার।

সমাবেশে প্রার্থীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরেন তরুণ প্রকৌশলী শামসুল আলম। একই সঙ্গে তিনি সন্ত্রাস, ভয়ভীতি ও পেশিশক্তির প্রভাবমুক্ত পরিবেশে ভোট গ্রহণের আহ্বান জানান। সভায় উপস্থিত চেয়ারম্যান ও সদস্য পদপ্রার্থীরা সন্ত্রাস পরিহার করে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার করেন।

আমবাড়িয়ার মতো চরমপন্থী প্রভাবের অভিযোগে আলোচিত এলাকায় এ ধরনের প্রকাশ্য উদ্যোগ তখনকার সময়ে ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, এর মধ্য দিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সহিংসতার পরিবর্তে সামাজিক সম্মান, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পরিচালনার প্রত্যাশা সামনে আনা হয়েছিল।

উদ্যোগের কেন্দ্রে ছিলেন শামসুল আলমঃ
ওজোপাডিকো লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিদ্যুৎ খাতের অভিজ্ঞ প্রকৌশলী শামসুল আলম স্মৃতিচারণ করে জানান, ১৯৮৮ সালের সেই সমাবেশটি তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে আছে।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তখনকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান ও মেম্বর পদপ্রার্থীদের সম্মান জানানো এবং তাঁদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ গড়ে তোলার উদ্দেশ্যেই আমবাড়িয়া সমাজ কল্যাণ সমিতি স্থানীয় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সভাটির আয়োজন করেছিল। ইউনিয়নের ১২টি গ্রামের মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন। প্রধান অতিথি অধ্যক্ষ আবেদ স্যার প্রার্থীদের সামনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের গুরুত্ব নিয়ে বক্তব্য দেন।

শামসুল আলম বলেন, তিনিও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অবাধ ও সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছিলেন। তাঁর স্মৃতিচারণে, সভায় উপস্থিত গ্রামবাসীরা অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেছিলেন এবং নির্বাচনে সন্ত্রাস পরিহারের অঙ্গীকারের মধ্য দিয়ে একটি ইতিবাচক বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল।

তিনি মনে করেন, সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নির্বাচনের প্রচলিত ভয়ভীতি ও প্রভাবনির্ভর পরিবেশ পরিবর্তনের যে চেষ্টা তাঁরা করেছিলেন, তার গুরুত্ব ছিল অনেক। সেই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের স্মৃতি আজও তাঁর কাছে বিশেষভাবে মূল্যবান।

বন্ধুদের স্মৃতিতে ফিরে দেখা সেই দিনঃ
আমবাড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বটগাছের নিচে আয়োজিত ওই সমাবেশে শামসুল আলমের বন্ধু নজরুল, হানিফ, ওমর, মাহুত আলী, বাগি, জোহা, নাবু, রেজাউল, কাজলসহ এলাকার আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত উপস্থিতি ও অংশগ্রহণের কথা আজও স্মরণ করেন তিনি।

শামসুল আলমের স্মৃতিচারণে উঠে আসে, সেই উদ্যোগ ছিল কেবল একটি নির্বাচনের আগে সভা আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত ছিল সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি, প্রার্থীদের দায়িত্বশীল আচরণে উৎসাহিত করা এবং সামাজিকভাবে সন্ত্রাসের প্রভাবকে প্রত্যাখ্যান করার একটি প্রচেষ্টা।

তবে ওই উদ্যোগের ফলে ইউনিয়নের সব ধরনের সন্ত্রাসী প্রভাব স্থায়ীভাবে নির্মূল হয়েছিল—এমন দাবি করার সুযোগ নেই। বরং ঐতিহাসিক তাৎপর্যটি ছিল প্রতিকূল পরিবেশেও স্থানীয় শিক্ষিত সমাজ ও সাধারণ মানুষ যে অবাধ নির্বাচন এবং ভোটারের স্বাধীন সিদ্ধান্তের পক্ষে সম্মিলিত অবস্থান নিতে পেরেছিলেন, সেই সাহসী প্রচেষ্টায়।

স্থানীয় উদ্যোগ থেকে গণতান্ত্রিক শিক্ষার বার্তাঃ
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকারব্যবস্থায় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন তৃণমূল পর্যায়ে গণতান্ত্রিক চর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এই নির্বাচনে ভোটারের স্বাধীনতা, প্রার্থীদের সমান সুযোগ, ভয়ভীতিমুক্ত প্রচারণা এবং শান্তিপূর্ণ ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মৌলিক শর্ত।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার আমবাড়িয়ায় ১৯৮৮ সালের উদ্যোগটি সেই বাস্তবতারই একটি স্থানীয় দৃষ্টান্ত। যেখানে সশস্ত্র প্রভাব ও আতঙ্কের অভিযোগে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা উঠে আসে, সেখানে শিক্ষিত তরুণদের একটি দল সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে অবাধ নির্বাচনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন।

শামসুল আলম ও তাঁর সহযোগীদের উদ্যোগকে তাই শুধু একটি পুরোনো নির্বাচনের স্মৃতি হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য পুরোপুরি বোঝা যাবে না। বরং এটি স্থানীয় সমাজে নাগরিক সচেতনতা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার একটি স্মারক।

সময়ের ব্যবধানে আমবাড়িয়ার সেই বটগাছের নিচের সভা হয়তো অনেকের স্মৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। কিন্তু ভয়ভীতির পরিবেশে মানুষের ভোটাধিকার ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার যে বার্তা সেদিন দেওয়া হয়েছিল, তা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ, গণতন্ত্রের শক্তি কেবল নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতায় নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি হলো ভোটারের স্বাধীনতা, প্রার্থীর দায়িত্বশীলতা এবং জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা।

আমবাড়িয়ার সেই উদ্যোগের মূল শিক্ষা—প্রতিকূলতা যত গভীরই হোক, সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত প্রয়াস গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

৫১৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০