সর্বশেষ

সারাদেশ

কমছে জুম চাষ, সংকুচিত হচ্ছে পাহাড়ের ঐতিহ্য

আল-মামুন, খাগড়াছড়ি 
আল-মামুন, খাগড়াছড়ি 

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:৩৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
খাগড়াছড়ির পাহাড়ে জুমের সোনালি ধানে উঁকি দিচ্ছে সবুজের সমারোহ। ধান, আদা, হলুদ, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, তিল ও মরিচসহ নানা ফসলের চাষ এখনো পাহাড়ি মানুষের খাদ্য ও জীবিকার অন্যতম অবলম্বন। তবে ফল ও সেগুনের বাগান সম্প্রসারণ, বসতি বৃদ্ধি এবং জুমের জমি সংকুচিত হওয়ায় প্রতিবছরই কমছে ঐতিহ্যবাহী এই চাষাবাদ। এতে জুমনির্ভর নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা তৈরি হচ্ছে।

খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ঢালে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে জুমের জমিতে বিভিন্ন ফসলের বীজ বপন করেন চাষিরা। তিন থেকে চার মাস পর আশ্বিনের শুরুতে ধান পাকতে শুরু করে। মাসের শেষদিকে পাকা ধান ঘরে তোলার উৎসব শুরু হয়, যা চলে প্রায় এক মাস ধরে। তবে জুম চাষের পরিমাণ কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্যবাহী কৃষিপদ্ধতির সঙ্গে যুক্ত মানুষের জীবিকা ও খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ধৈইল্যাতলীর জুম চাষি দুলাল ত্রিপুরা (৬১) বলেন, এবার জুমে ধানের পাশাপাশি আদা, হলুদ, চিনাল, ভুট্টা, মারফা, মিষ্টি কুমড়া, আমিলা, তিল ও ছিকন মরিচ আবাদ করেছেন। ধান তোলা শুরু হয়েছে।

তেরাংতৈকালাই (রিসাং) ঝরনা এলাকার জুম চাষি সুনীল ত্রিপুরা জানান, দেড় আড়ি ধানের পাশাপাশি তিনি মারফা, ভুট্টা, তিল ও কলা লাগিয়েছেন। ফলন ভালো হবে বলে মনে করছেন তিনি।

দীঘিনালা উপজেলার সীমানাপাড়া এলাকার কার্বারি চয়ন ত্রিপুরা বলেন, আগে তাঁদের দুর্গম এলাকায় অনেকেই জুম চাষ করতেন। এখন বিভিন্ন ফলের বাগান, সেগুনবাগান ও বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে। ফলে জুম চাষের পরিমাণ কমেছে। সামনে খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে বলেও আশঙ্কা করেন তিনি।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার দুর্গম হাচুকপাড়া এলাকার জুম চাষি দুলাল ত্রিপুরা, বিক্রম ত্রিপুরা ও অগ্নিলাল ত্রিপুরা বলেন, একই জায়গায় প্রতিবছর চাষ করার কারণে মাটির উর্বরতা কমে গেছে। ফলে আগের মতো ফলন পাওয়া যায় না। এখন জুমে সার ও কীটনাশকও ব্যবহার করতে হচ্ছে। অথচ একসময় এসবের প্রয়োজন হতো না। জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল মানুষ কীভাবে টিকে থাকবে, সেই প্রশ্নও তোলেন তাঁরা।

কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে খাগড়াছড়িতে ১ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে জুমের আবাদ হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এই পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪০ হেক্টরে।

জুম চাষিদের দাবি, জুম চাষ বন উজাড়, মাটিক্ষয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হলেও এই চাষের সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও কমছে। টিলায় স্থায়ী বাগান ও বসতি গড়ে ওঠায় ভবিষ্যতে জুমের জমি আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দীঘিনালার নয়মাইল এলাকার সাবেক ইউপি সদস্য গণেশ ত্রিপুরা বলেন, প্রতিবছর জুম চাষের পরিমাণ কমছে। এর অন্যতম কারণ ফলের বাগান বৃদ্ধি। জুম চাষিরা সরকারি কৃষিঋণও পান না। সরকার ঋণ সহায়তা দিলে চাষিরা আরও উৎসাহিত হয়ে জুমের আবাদ বাড়াতে পারেন।

মাটিরাঙ্গা উপজেলার ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য শান্তিময় ত্রিপুরা জানান, জেলার মধ্যে মাটিরাঙ্গা উপজেলার আলুটিলা হৃদয়মেম্বারপাড়া এলাকায় জুম চাষ বেশি হয়। সেখানে প্রায় এক হাজার পরিবারের মধ্যে তিন শ' পরিবার জুম চাষ করেছে। তাঁর ভাষ্য, মাটির আর্দ্রতা কমে যাওয়ায় ফলনও কমেছে। এর পাশাপাশি জুমের জায়গায় আম, সেগুনসহ বিভিন্ন ধরনের বাগান গড়ে ওঠায় চাষের জমিও কমে গেছে।

তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার যেসব পরিবার জুম চাষের ওপর নির্ভরশীল, তারা চাষ করতে না পারলে খাদ্যসংকটে পড়তে পারে। সরকার জুম চাষিদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়ালে এ চাষে মানুষের আগ্রহ বাড়বে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেন, জেলায় কয়েক বছর ধরেই জুম চাষের পরিমাণ ধারাবাহিকভাবে কমছে। কৃষি বিভাগ বিভিন্নভাবে চাষিদের সহায়তা দিয়ে জুম চাষে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর খাদ্যনিরাপত্তা ও ঐতিহ্যের সঙ্গে জুম চাষের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তবে জমির ব্যবহার পরিবর্তন, বাগান সম্প্রসারণ এবং চাষিদের আগ্রহ কমে যাওয়ায় প্রাচীন এই কৃষিপদ্ধতি ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর কাছে জুম শুধু একটি কৃষিপদ্ধতি নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জীবনযাপন, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক সম্পর্ক ও উৎসব। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই চাষাবাদ এখন নানা পরিবর্তনের চাপে পড়েছে।

১১৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০