সর্বশেষ

জাতীয়

সংসদে চিকিৎসক সংকট, ক্যানসার হাসপাতাল ও বিদ্যুৎ নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:০৭ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকের ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য, আগামী অর্থবছরের মধ্যে আট বিভাগে ক্যানসার হাসপাতালের সমন্বিত সেবা চালুর পরিকল্পনা এবং ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় এনে কিউআর কোডভিত্তিক ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালুর ঘোষণা এসেছে জাতীয় সংসদে। একই অধিবেশনে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া, লোডশেডিং ও ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়েছে। রাজধানীর চারপাশের নৌপথে ওয়াটার বাস ফের চালু এবং ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নিয়ন্ত্রণেও সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানানো হয়।

সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এসব তথ্য ও সিদ্ধান্ত উঠে আসে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম ও ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যরা লিখিত প্রশ্নোত্তর, ৭১ বিধির মনোযোগ আকর্ষণ নোটিশ এবং ৬৮ বিধির আলোচনায় বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সংসদে জানান, ২০২৬ সালে দেশে মোট ৮৮ হাজার ৯০৯ জন চিকিৎসকের প্রয়োজন। এর বিপরীতে সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে কর্মরত চিকিৎসকের সংখ্যা ৩০ হাজার ৩১১ জন। প্রয়োজনের তুলনায় ঘাটতি রয়েছে ৫৮ হাজার ৫৯৮ জন চিকিৎসকের।

বগুড়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য মো. মোশারফ হোসেনের লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৪১ হাজার ৮০৬টি। এর মধ্যে ৩০ হাজার ৩১১ জন কর্মরত এবং ১১ হাজার ৪৯৫টি পদ শূন্য রয়েছে।

সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় জনবল ঘাটতি পূরণে বিভিন্ন বিসিএসের মাধ্যমে নিয়োগ কার্যক্রম চলছে বলেও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ৪৪তম ও ৪৮তম বিশেষ বিসিএসের মাধ্যমে ইতিমধ্যে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ৪৫তম, ৪৬তম, ৪৭তম ও ৫০তম বিসিএসের মাধ্যমে সহকারী সার্জন নিয়োগের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

ময়মনসিংহ-১ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ সালমান ওমরের লিখিত প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, আগামী অর্থবছরের মধ্যে দেশের আট বিভাগে নির্মাণাধীন ক্যানসার হাসপাতালগুলোর পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত সেবা চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

১৫ তলাবিশিষ্ট এসব বিভাগীয় বিশেষায়িত হাসপাতালে ক্যানসারের পাশাপাশি কিডনি ও হৃদরোগের চিকিৎসাও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের আশা, এসব হাসপাতাল চালু হলে রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক চিকিৎসার ওপর চাপ কমবে এবং দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষায়িত চিকিৎসার সুযোগ পাবে।

অধিবেশনে হামের টিকার সরবরাহ নিয়ে সরকারের আগের সময়ের নীতি পরিবর্তন নিয়েও আলোচনা হয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে টিকা সংগ্রহের প্রচলিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে মুক্ত দরপত্র চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর ফলে টিকা সরবরাহে জটিলতা তৈরি হয় বলে তিনি সংসদে উল্লেখ করেন।

মন্ত্রী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৪১ হাজার ৪০৭ কোটি টাকা এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। এসব অর্থের বড় অংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, বিনামূল্যে ওষুধ, অবকাঠামো এবং টিকাদান কর্মসূচিসহ পরিচালন ও উন্নয়ন কাজে ব্যয় করা হয়।

রাজধানীর যানজট কমাতে ঢাকার চারপাশের বৃত্তাকার নৌপথে আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে আবার ওয়াটার বাস চালুর কথা জানিয়েছেন নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।

কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, আগের সময়ে ওয়াটার বাস পরিচালনায় অব্যবস্থাপনার কারণে বছরে গড়ে ৫ কোটি ৭০ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এবার নতুন ব্যবস্থাপনায় সেবাটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া বুড়িগঙ্গাসহ বিভিন্ন নদীতে বর্জ্য ও দূষণ রোধে ৪২৪টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করে কাজ চলছে বলেও জানান তিনি। বর্তমানে দেশে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কিলোমিটার নৌপথ সচল রয়েছে এবং আরও ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার নৌপথে নিয়মিত ড্রেজিং করা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরের জমি নিয়েও সংসদে তথ্য দেওয়া হয়। নৌমন্ত্রী জানান, অনিয়ম করে লিজ দেওয়া দুটি জায়গা উদ্ধার করা হয়েছে। রেল ও নৌ মন্ত্রণালয়ের যৌথ মালিকানার জমি নিয়ে বিরোধ আরবিট্রেশনের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে আগামী দুই মাসের মধ্যে বন্দরের জমি দখলমুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

ওষুধের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য নির্ধারণ ও সংশোধনে নতুন কাঠামোর কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সংসদে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদন ও আমদানি ব্যয়, শুল্ক-কর, সরবরাহব্যবস্থার খরচ, দেশি-বিদেশি বাজারদর, বিকল্প ওষুধের প্রাপ্যতা এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে দাম নির্ধারণ করা হবে।

ওষুধ ও প্রসাধন আইন ২০২৩-এর অধীনে পুনর্গঠিত ১৫ সদস্যের ওষুধ মূল্য নির্ধারণ কমিটি এ কাজ তদারক করবে।

সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রি করলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, অনধিক দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে বলেও সংসদে জানানো হয়।

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে নিবন্ধনের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিটি অটোরিকশার জন্য এলাকাভিত্তিক কিউআর কোড ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হবে।

ঢাকায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন ক্যামেরায় বিভিন্ন অনিয়ম শনাক্ত হলেও নম্বর প্লেট না থাকায় জরিমানা করা কঠিন হচ্ছে বলে জানান তিনি। নতুন ব্যবস্থায় একটি নিবন্ধন নম্বরের বিপরীতে একাধিক অটোরিকশা চালানো ঠেকানোর লক্ষ্য রয়েছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ অনিয়ন্ত্রিত থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যানবাহন মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। ঢাকায় অনানুষ্ঠানিক চার্জিংকেন্দ্রের কারণে সরকারের রাজস্ব ক্ষতির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

বিরোধী দলীয় জোট থেকে বহিষ্কৃত সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে অধিবেশনে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়।

চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে গাজী নজরুল ইসলামের সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার অধিকার রয়েছে। তবে বিরোধী দল আপত্তি জানালে তাঁকে কমিটি থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, গাজী নজরুল ইসলামকে নৈতিক স্খলন ও দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে বহিষ্কার করা হয়েছে। তাই তাঁকে বিরোধী দলের কোটায় কোনো কমিটিতে রাখা উচিত নয়।

পরে গাজী নজরুল ইসলামকে বাদ দিয়েই সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি পুনর্গঠনের প্রস্তাব পাস হয়।

এ অধিবেশনে কার্যপ্রণালী-বিধি সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি, পিটিশন কমিটি, সরকারি প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত কমিটি এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটি গঠন করা হয়।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের বকেয়া, লোডশেডিং, ডিমান্ড চার্জ, মিটার ভাড়া এবং ক্যাপাসিটি চার্জ নিয়ে সংসদে সবচেয়ে উত্তপ্ত আলোচনা হয়।

পাবনা-১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বিদ্যুৎ বিলের ডিমান্ড চার্জ ও মিটার ভাড়াকে ‘ডিজিটাল চাঁদাবাজি’ আখ্যা দিয়ে তা বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা ২৯ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও সর্বোচ্চ চাহিদা প্রায় ১৭ হাজার মেগাওয়াট। এরপরও লোডশেডিং হচ্ছে।

তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের বকেয়া, অলস বিদ্যুৎকেন্দ্রের ক্যাপাসিটি চার্জ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খাতে বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনেরও দাবি জানান।

সরকারের পক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সংকটের পেছনে আগের সরকারের আমদানিনির্ভর পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত দুর্বলতা রয়েছে। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, ভোলার গ্যাস ব্যবহার, মাতারবাড়ীতে এলএনজি অবকাঠামো এবং কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনার কথা তিনি তুলে ধরেন।

বিরোধী দলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমান বলেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎবিহীন থাকছে। কুইক রেন্টাল ও অন্যায্য ক্যাপাসিটি চার্জের কারণে বিদ্যুৎ খাতে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে সরকার ও বিরোধী দলের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে শক্তিশালী টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ ইসলাম অমিত জানান, সারা দেশের মিটার ভাড়া একবারে মওকুফ করতে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে তা সম্ভব নয়। তবে গ্রাহক নিজ খরচে মিটার কিনলে তাঁকে মাসিক মিটার ভাড়া দিতে হবে না।

তিনি জানান, ২০৩০ সালের মধ্যে অধিকাংশ গ্রাহককে ডিজিটাল প্রিপেইড মিটারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি অবসরপ্রাপ্ত পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ক্যাপাসিটি চার্জ ছাড়াই ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের ৬৬০ মেগাওয়াটের বন্ধ ইউনিট চালুর প্রস্তুতি এবং এইচএফওভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য ৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের কথাও জানান প্রতিমন্ত্রী। পাশাপাশি রুফটপ সোলার সম্প্রসারণ এবং উদ্বৃত্ত সৌরবিদ্যুৎ সরকারের কাছে বিক্রির সুযোগ দেওয়ার কথাও সংসদে তুলে ধরা হয়।

১৪৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন