অক্টোবর-নভেম্বরে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা
মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:০১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আগস্টের পর সেপ্টেম্বরের শুরুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। আবহাওয়ার পরিবর্তন, এডিস মশার ঘনত্ব, মশা নিয়ন্ত্রণে ঘাটতি এবং চিকিৎসা নিতে দেরি করাকে পরিস্থিতি জটিল হওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের আশঙ্কা, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে ডেঙ্গু সংক্রমণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম সাত দিনে দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৮ হাজার ৫৭ জন। একই সময়ে মারা গেছেন ২৪ জন। এর আগে আগস্টে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন এবং মৃত্যু হয় ৪৩ জনের। জুলাইয়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯ হাজার ২০৬ এবং মৃত্যু ৩৬ জন।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতও অক্টোবরের সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। গত রোববার জাতীয় সংসদের জেনারেল ওসমানী গেটে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, অক্টোবরে ডেঙ্গুর বড় ধাক্কা সামলাতে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। একই সঙ্গে কর্মস্থল ও বাসাবাড়ি পরিষ্কার রাখার পাশাপাশি দেশজুড়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু প্রচলিত ফগিং বা ধোঁয়া ছিটানো যথেষ্ট নয়। এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত করে লার্ভা ধ্বংসের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা প্রয়োজন। স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত নজরদারি ও মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার ওপরও তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন।
রোগতত্ত্ব, রোগী নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর উপদেষ্টা ও সাবেক বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। তাঁর মতে, মশা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুযোগ বাড়ানো দরকার।
ডেঙ্গু এখন শুধু রাজধানী ঢাকাকেন্দ্রিক নয়। দেশের বিভিন্ন জেলায়ও রোগী শনাক্ত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানুষের চলাচল ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের কারণে সংক্রমণ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
চলতি বছরের পরিস্থিতিতে ডেঙ্গু ভাইরাসের সেরোটাইপ নিয়েও নতুন করে আলোচনা হচ্ছে। সাম্প্রতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞ বিশ্লেষণে দেশে ডেন-৩ সেরোটাইপের উপস্থিতি বেড়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকায় ডেঙ্গু আক্রান্ত ৭১ জনের নমুনা বিশ্লেষণে ৯১ দশমিক ৫ শতাংশ নমুনায় ডেন-৩ এবং ৮ দশমিক ৫ শতাংশে ডেন-২ শনাক্ত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, একজন ব্যক্তি আগে একটি সেরোটাইপে আক্রান্ত হওয়ার পর অন্য সেরোটাইপে আক্রান্ত হলে কিছু ক্ষেত্রে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হলেই গুরুতর রোগ হবে—এমন সরল সিদ্ধান্ত বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
জনস্বাস্থ্যবিদ ও প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে এডিস মশার প্রজননস্থল, লার্ভা এবং প্রাপ্তবয়স্ক মশা—সব পর্যায়কে বিবেচনায় নিয়ে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পনা করতে হবে। শুধু দৃশ্যমানভাবে ধোঁয়া ছিটানোর পরিবর্তে কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মশা নিয়ন্ত্রণে জোর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। তাঁদের মধ্যে ৮৫১ জন পুরুষ এবং ৪৬৩ জন নারী।
রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টার হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছর দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১২১। মৃত ব্যক্তিদের মধ্যে ৬৮ জন নারী এবং ৫৩ জন পুরুষ। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চারজনের মধ্যে তিনজন নারী ও একজন পুরুষ।
এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ জনে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এখনই মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং হাসপাতালে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি জ্বর হলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে