ফুলবাড়ীতে কয়লা তোলার আগে স্থানীয়দের জীবিকার ব্যবস্থায় জোর প্রধানমন্ত্রীর
বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১২:৪৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে স্থানীয় বাসিন্দাদের বসতবাড়ি ও কৃষিজমির বিষয়টি বিবেচনার পাশাপাশি তাঁদের আয়-রোজগারের বিকল্প ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, কয়লা উত্তোলনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পরিবেশের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে।
বুধবার বিকেলে জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সাবিকুন্নাহারের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়।
সাবিকুন্নাহার তাঁর প্রশ্নে বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সরকার উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের বিষয়টি বিবেচনা করছে। এ পদ্ধতিতে তুলনামূলক বেশি কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হলেও কৃষিজমি, বসতি, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়েও একই ধরনের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলা প্রয়োজন হলেও কয়লা উত্তোলনের কারণে কৃষিজমি নষ্ট হওয়া, মানুষের বসতভিটা হারানো কিংবা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি কোনোভাবেই কাম্য নয়। এ কারণে প্রকল্প নেওয়ার আগে পূর্ণাঙ্গ পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব সমীক্ষা প্রকাশ এবং স্থানীয় মানুষের সম্মতি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় সম্পদ কাজে লাগানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। ফুলবাড়ীর কয়লা মানসম্মত হওয়ায় তা উত্তোলন করা গেলে জ্বালানি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হতে পারে।
তবে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের আগে স্থানীয় মানুষের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কীভাবে পুনর্বাসন ও জীবিকার ব্যবস্থা করা যায়, তা আগে নির্ধারণ করা হবে। তাঁদের আয়-রোজগার যাতে বন্ধ না হয়, সে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প গ্রহণের কথাও বলেন তিনি।
একই সঙ্গে পরিবেশগত বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব দিক পর্যালোচনা করেই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড—বাপেক্সকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংসদে জানান প্রধানমন্ত্রী।
সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে বাপেক্সকে দুর্বল অবস্থায় রাখা হয়েছিল। অপর্যাপ্ত গ্যাস অনুসন্ধান এবং আমদানিনির্ভরতার কারণে তৈরি হওয়া জ্বালানি সংকট কাটাতে বর্তমান সরকার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে।
প্রধানমন্ত্রী জানান, ১৫০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের কর্মসূচির আওতায় ইতিমধ্যে ৩০টি কূপের কাজ শেষ হয়েছে। এসব কূপ থেকে দৈনিক প্রায় ১৪০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে আরও সাতটি কূপ খননের কাজ চলছে। এগুলো শেষ হলে অতিরিক্ত প্রায় ৮৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
দেশে নতুন গ্যাসের উৎস খুঁজতে ৪ হাজার ৫০০ লাইন কিলোমিটার দ্বিমাত্রিক এবং ৪ হাজার ২০০ বর্গকিলোমিটার ত্রিমাত্রিক ভূকম্পন জরিপের কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাপেক্সের সক্ষমতা বাড়াতে আরও দুটি নতুন রিগ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি সমুদ্র ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অফশোর মডেল পিএসসি ২০২৬ অনুমোদনের পর দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে এবং অনশোর গ্যাস অনুসন্ধানের অনুমোদন প্রক্রিয়াও চলছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।
তাঁর মতে, অফশোর ও অনশোর অনুসন্ধানের মাধ্যমে নতুন গ্যাসের মজুত পাওয়া গেলে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথাও সংসদে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনির প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
সৌরপ্যানেল তৈরির প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যে কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দেশে সোলার প্যানেল ও লিথিয়াম ব্যাটারি উৎপাদনের শিল্প গড়ে তুলতেও কর সুবিধা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে যাঁরা রুফটপ সোলার স্থাপন করবেন, তাঁদের উৎপাদিত বিদ্যুৎ সরকার প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ১৫ পয়সা দরে কিনবে। বাল্ক রেটের অতিরিক্ত অর্থ প্রণোদনা হিসেবে দেওয়ার কথাও জানান তিনি।
সরকারি ভবন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও হাসপাতালসহ গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপনের জন্য জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য একটি নির্দেশিকাও প্রস্তুত করা হয়েছে।
সৌরবিদ্যুতের পাশাপাশি পানি, বায়ু ও বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার আরও বাড়ানো সম্ভব হবে বলে আশা করছে সরকার।
১২৩ বার পড়া হয়েছে