সর্বশেষ

জাতীয়

ঘরে-বাইরে নারীর নিরাপত্তাহীনতা: সহিংসতা বাড়লেও সমাজ নীরব কেন?

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬ ৮:৫৭ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারী নির্যাতনের বেশ কয়েকটি ঘটনা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া এসব ভিডিওতে নারীর ওপর চালানো নির্মম নির্যাতনের যে চিত্র উঠে এসেছে, তা যে কোনো বিবেকবান মানুষকে নাড়া দেওয়ার মতো। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এসব ঘটনার একটি বড় অংশই ঘটছে নারীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত পরিবারে। আবার কর্মক্ষেত্রেও নারীরা যে সবসময় নিরাপদ, তেমনটিও নয়।
প্রতীকী ছবি

সম্প্রতি পোশাকশিল্পের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের কান্ট্রি ম্যানেজারের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, নিজের শিশু সন্তানের সামনেই ওই ব্যক্তি তার স্ত্রীকে নির্মমভাবে মারধর করছেন। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘ ১৩ বছরের দাম্পত্য জীবনে ওই নারী নিয়মিতই স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এমনকি তিনি বিবাহবিচ্ছেদের নোটিশ দেওয়ার পরও তাকে হয়রানি ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তিন সন্তানের জনক একজন শিক্ষিত ও বিত্তবান মানুষের এমন আচরণ শুধু পারিবারিক সহিংসতার ভয়াবহতাই নয়, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধের সংকটকেও সামনে নিয়ে আসে।

এর ঠিক এক দিন আগে নির্যাতনের শিকার এক মডেল ও অভিনেত্রীও গণমাধ্যমে তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন। রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে বিজ্ঞাপনের চুক্তির কথা বলে ডেকে নিয়ে তাকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মডেল ও অভিনেত্রী স্নিগ্ধা চৌধুরী। এ ঘটনায় তিনি খিলক্ষেত থানায় মামলা করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, বিজ্ঞাপনের চুক্তি স্বাক্ষরের কথা বলে তাকে হাসপাতালে ডাকা হয়। সেখানে যাওয়ার পর তিনি শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন। এ সময় অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে তাকে ভয় দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্নিগ্ধা চৌধুরীর দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি দেশের একটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর হওয়ায় ঘটনার পরপরই তিনি আইনি পদক্ষেপ নিতে সাহস পাননি। ব্যক্তিজীবন ও পেশাগত ভবিষ্যতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কায় তিনি প্রথমে নীরব ছিলেন। পরে সাহস করে থানায় গিয়ে মামলা করেন।

এই দুটি ঘটনা পাশাপাশি রাখলে একটি কঠিন বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—নারীরা আজ ঘরে যেমন নিরাপদ নন, তেমনি কর্মক্ষেত্র, রাস্তাঘাট কিংবা জনসমাগমের স্থানেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। অর্থাৎ, নারীর জন্য নিরাপদ একটি পরিসর তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে সমাজের প্রায় প্রতিটি স্তর।

একসময় ধারণা করা হতো, নারী নির্যাতন মূলত নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, শিক্ষিত, বিত্তবান ও উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যেও নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনা কম নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মর্যাদা, অর্থনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার কারণে এসব ঘটনা আরও বেশি আড়ালে থেকে যায়।

সাম্প্রতিক একটি ঘটনায় নির্যাতনের শিকার নারী অভিযোগ করেছেন, তার স্বামী তাকে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কে জড়াতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন। তিনি সাহস করে বিষয়টি প্রকাশ্যে এনেছেন। কিন্তু সমাজের উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী মহলে এমন বহু ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। সামাজিক সম্মান, লোকলজ্জা কিংবা পারিবারিক মর্যাদা হারানোর ভয়ে অনেক নারী নির্যাতনের কথা কাউকে জানান না। নীরবে সহ্য করতে করতে একসময় মানসিক ও শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েন।

অতিরিক্ত অর্থের লোভ, মাদকের বিস্তার, পারিবারিক মূল্যবোধের অবক্ষয় এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ঘাটতি—সবকিছু মিলিয়েই সমাজে নারীর প্রতি সহিংসতার প্রবণতা বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক অস্থিরতা, বেকারত্ব, দারিদ্র্য, অপসংস্কৃতির বিস্তার এবং নারীবিদ্বেষী মানসিকতা।

পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রের সবচেয়ে ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ একক। রাষ্ট্র ও সমাজে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার প্রতিফলন কোনো না কোনোভাবে পরিবারেও দেখা যায়। সমাজে যখন সহিংসতা, বিদ্বেষ ও অপরাধের বিস্তার ঘটে এবং তার যথাযথ প্রতিকার হয় না, তখন তার প্রভাব পরিবারেও পড়ে। ফলে পারিবারিক সহিংসতা শুধু একটি পরিবারের অভ্যন্তরীণ সমস্যা নয়; এটি সামগ্রিক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকটেরও প্রতিচ্ছবি।

মাদকের বিস্তার, মানসিক অস্থিরতা, গ্যাং কালচার এবং সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বাড়িয়ে দিয়েছে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সাইবার বুলিং ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের নানা সংকট। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নারীদের অশালীন ভাষায় আক্রমণ, ব্যক্তিগত ছবি বিকৃত করে ছড়িয়ে দেওয়া এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ভুয়া ও আপত্তিকর ছবি তৈরি—এসবও এখন নতুন ধরনের সহিংসতায় পরিণত হয়েছে। এর ফলে অনেক নারী ঘরে-বাইরে তো বটেই, অনলাইন জগতেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

নারীর প্রতি সহিংসতার বাস্তব চিত্র যে কতটা ভয়াবহ, বিভিন্ন গবেষণার তথ্যেও তার প্রতিফলন দেখা যায়। গবেষণায় উঠে এসেছে, বাংলাদেশে ৮৭.০৭ শতাংশ নারী স্বামীর মাধ্যমে কোনো না কোনো ধরনের নির্যাতনের শিকার হন। এর মধ্যে ৮১.০৬ শতাংশ মানসিক, ৫৩.০২ শতাংশ অর্থনৈতিক, ৩৬.০৫ শতাংশ যৌন এবং ৬৪.০৬ শতাংশ নারী শারীরিক নির্যাতনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।

তবে বাস্তবে নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ পারিবারিক সহিংসতার অসংখ্য ঘটনা চার দেয়ালের মধ্যেই চাপা পড়ে থাকে। নির্যাতনের শিকার অনেক নারী সামাজিক চাপ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা লোকলজ্জার কারণে মুখ খোলেন না। এর পরিণতিতে অনেক পরিবারে দীর্ঘস্থায়ী অশান্তি তৈরি হয়। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, আবার অনেক নারী বাধ্য হন বিবাহবিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নিতে।

এসব পরিসংখ্যান ও ঘটনা একটি কথাই বলে—বাংলাদেশের নারীরা এখনো নিরাপদ ও স্বস্তির জীবন থেকে অনেক দূরে। শুধু নারী হওয়ার কারণে যদি একজন মানুষকে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে বসবাস করতে হয়, তাহলে সেই সমাজকে কতটা সভ্য বলা যায়, সেটিই বড় প্রশ্ন।

দুধের শিশু থেকে বৃদ্ধা—কেউই যেন নারীর প্রতি সহিংসতার ঝুঁকি থেকে মুক্ত নন। রাস্তায় একজন নারীকে উত্ত্যক্ত করা, তার পথ আটকে দেওয়া, পোশাক ধরে টান দেওয়া, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল কিংবা ধর্ষণের মতো অপরাধ ঘটছে। অথচ আশ্চর্যের বিষয়, এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত পুরুষদের একটি অংশই আবার নারীর পোশাক, চলাফেরা ও চরিত্র নিয়ে বিচার করার নৈতিক দায়িত্ব নিজেদের হাতে তুলে নেয়। এই দ্বিচারিতা বন্ধ না হলে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করা কঠিন।

নারীর সুরক্ষায় দেশে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, ২০১০’ রয়েছে। তবে আইন থাকলেই যে সমস্যার সমাধান হয় না, বাস্তব পরিস্থিতি তারই প্রমাণ। আইনের যথাযথ প্রয়োগের ঘাটতি, মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত জনবল ও বাজেটের সংকট এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আইন সম্পর্কে সচেতনতার অভাব—সব মিলিয়ে অনেক ভুক্তভোগী কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এ আইনের মূল লক্ষ্য তাৎক্ষণিক শাস্তির পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে সুরক্ষা দেওয়া। পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় সহায়তার জন্য ১০৯ হেল্পলাইনও চালু রয়েছে।

তবে শুধু আইন ও আদালতের ওপর নির্ভর করে পারিবারিক সহিংসতা বন্ধ করা সম্ভব নয়। মাঠপর্যায়ে স্থানীয় উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ। ‘নাগরিক উদ্যোগ’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়ার্ড পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব বিকাশ এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার উদ্যোগ নিয়ে কাজ করছে। কারণ বাস্তবতা হলো, অনেক নারী আইনি জটিলতায় না গিয়ে সংসার টিকিয়ে রাখতে চান। তাদের মূল চাওয়া—নির্যাতন বন্ধ হোক এবং পরিবারে নিরাপদ পরিবেশ ফিরে আসুক।

তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের পাশাপাশি প্রয়োজন সমাজের মানসিকতার পরিবর্তন। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রের কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গণমাধ্যমে নারীর মর্যাদাপূর্ণ ও ইতিবাচক উপস্থাপন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো জরুরি। একই সঙ্গে পরিবার থেকেই নারীকে মানুষ হিসেবে সম্মান করার শিক্ষা দিতে হবে।

বর্তমান সরকারও নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও নারীর ক্ষমতায়নে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলছে। ক্ষমতায় আসার আগে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল দেশব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যার তথ্য সংগ্রহ এবং নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুদের আইনি ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে একটি সেল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিল। সরকার গঠনের পর সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেছেন, নির্বাচনি ইশতেহারে নারী ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। নারী শিক্ষার প্রসার, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি এবং মাদক প্রতিরোধে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে উৎসাহিত করার কথাও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

তবে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, গণমাধ্যম, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষ—সবাইকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

নারীকে নিরাপদ রাখতে হলে শুধু আইন তৈরি করলেই হবে না; আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। শুধু অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করলেই হবে না; অপরাধের সামাজিক কারণগুলোও দূর করতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, নারীর প্রতি সহিংসতাকে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

কারণ একজন নারী যখন ঘরে নির্যাতিত হন, তখন সেটি শুধু একটি পরিবারের সমস্যা থাকে না। একজন নারী যখন কর্মক্ষেত্রে নিপীড়নের শিকার হন, তখন সেটি শুধু তার ব্যক্তিগত সংকট নয়। প্রতিটি নির্যাতনের ঘটনা আমাদের সমাজের মূল্যবোধ, বিচারব্যবস্থা এবং মানবিকতার সামনে একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে সমাজকে আর নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করলে চলবে না। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু নারীর অধিকার রক্ষা নয়; বরং একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সভ্য সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করা।

১৩১ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন