বান্দরবান সদর হাসপাতালে ৪ কোটি টাকার টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ
বুধবার, ১ জুলাই, ২০২৬ ৪:৫৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বান্দরবান সদর হাসপাতালে ওষুধ, কেমিক্যাল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়ে প্রায় ৪ কোটি টাকার টেন্ডারকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কার্যাদেশ পাওয়ার মাত্র ১৬ দিনের মধ্যে ৯০ শতাংশ মালামাল সরবরাহের দাবি করলেও সরেজমিনে সেই পরিমাণ সরঞ্জাম দেখাতে না পারায় প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ অস্বীকার করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার হওয়ায় অনিয়মের সুযোগ নেই। তবে পুরো বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
বান্দরবান সদর হাসপাতালে ওষুধ, কেমিক্যাল, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, ব্যান্ডেজ, লিনেন ও আসবাবপত্রসহ ছয়টি খাতে প্রায় ৪ কোটি টাকার টেন্ডারকে কেন্দ্র করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, টেন্ডারের গোপন মূল্যকোড আগে থেকেই কয়েকজন ঠিকাদারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, একটি সিন্ডিকেট পুরো টেন্ডার প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করেছে। এর ফলে এএসএম নামে একটি প্রতিষ্ঠান পাঁচটি এবং আলমগীর নামে আরেক ঠিকাদার একটি কার্যাদেশ পেয়েছেন।
গত ১৩ জুন কার্যাদেশ দেওয়া হয়। টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী, ৯০ দিনের মধ্যে মালামাল সরবরাহ সম্পন্ন করার কথা। বরাদ্দের মধ্যে স্বাস্থ্য বিভাগের অর্থায়নে ওষুধ কেনার জন্য ১ কোটি ৬০ লাখ ৭২ হাজার টাকা, পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে ৩১ লাখ টাকা, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি কেনায় ৭৪ লাখ ১৮ হাজার টাকা, কেমিক্যালে ৮০ লাখ ৩৬ হাজার টাকা, ব্যান্ডেজে ১৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকা এবং লিনেন ও আসবাবপত্র খাতে পৃথকভাবে ১২ লাখ ৩৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন ডা. সানাই ত্রিপুরা। কমিটিতে আরও ছিলেন সিনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. দেবরাজ বৈদ্য, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. উথেন ক্য, আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অতনু চৌধুরী, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক সুভাষ দাশ এবং গণপূর্ত বিভাগের একজন প্রকৌশলী।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মচারীর অভিযোগ, ওষুধ ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতি ক্রয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষার ফি থেকে আদায় হওয়া অর্থ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে আত্মসাতের চেষ্টা হচ্ছে। তাঁর দাবি, ওই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক সুভাষ দাশ। একই সঙ্গে নতুন টেন্ডারে সরবরাহ করা ফার্নিচার ও চিকিৎসা যন্ত্রপাতির মান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
অন্যদিকে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রধান সহকারী কাম হিসাবরক্ষক সুভাষ দাশ জুন মাসের গুরুত্বপূর্ণ ক্লোজিংয়ের সময় টানা সাত দিন অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁর ভাষ্য, অনুমোদন ছাড়া কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা দায়িত্ব পালনে অসহযোগিতার শামিল।
এ বিষয়ে টেন্ডার মূল্যায়ন কমিটির সদস্য ও সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. অতনু চৌধুরী বলেন, টেন্ডারের শর্ত অনুযায়ী ঠিকাদার মালামাল সরবরাহ করছেন। ইতোমধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ মালামাল গ্রহণ করা হয়েছে এবং সরবরাহ করা ওষুধ রোগীদের দেওয়া হচ্ছে।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এই দাবির সঙ্গে সরেজমিন পর্যবেক্ষণের মিল পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে দাবি অনুযায়ী ৯০ শতাংশ মালামাল দেখাতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ফলে সরবরাহের অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, ই-জিপি পদ্ধতিতে টেন্ডার হওয়ায় অনিয়মের সুযোগ নেই। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের কাগজপত্র ও দরপত্র যাচাই-বাছাই শেষে অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, টেন্ডার মূল্যায়নের জন্য পৃথক ছয় সদস্যের কমিটি রয়েছে এবং তিনি ওই কমিটির সদস্য নন। তাঁর দাবি, একটি প্রভাবশালী মহলের পছন্দের ঠিকাদার কাজ না পাওয়ায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে। সব মালামাল যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও সাজানোর পর তা গণমাধ্যমের সামনে উপস্থাপন করা হবে বলেও জানান তিনি।
অভিযোগকারী পক্ষের বক্তব্য এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যার পরও টেন্ডার প্রক্রিয়া, মালামাল সরবরাহ এবং অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকেরা।
১১৬ বার পড়া হয়েছে