ঈশ্বরগঞ্জের কাঁচামাটিয়া নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকট
রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:৪৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দখল ও দূষণের চাপে নাব্যতা হারিয়ে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী কাঁচামাটিয়া নদী। একসময় এই নদীকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল ঈশ্বরগঞ্জ শহরের অর্থনীতি, জীবিকা ও যোগাযোগ ব্যবস্থা। বর্তমানে নদীর বুকে চর জেগে উঠেছে, পানি দূষিত হয়ে পড়েছে, আর পৌরসভার বর্জ্য ফেলার স্থানে পরিণত হওয়ায় নদীটি কার্যত মৃতপ্রায় হয়ে গেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ২৪ দশমিক ৮৭ কিলোমিটার দীর্ঘ এই নদীটি ঈশ্বরগঞ্জ ও নান্দাইল উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভৈরবে মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। ঈশ্বরগঞ্জ অংশে এটি ‘কাঁচামাটিয়া’ এবং নান্দাইল অংশে ‘নরসুন্দা’ নামে পরিচিত। নদীটির গড় প্রস্থ প্রায় ১৩৮ মিটার হলেও দখলদারদের কারণে তা অনেক স্থানে সংকুচিত হয়ে খালে পরিণত হয়েছে।
একসময় খরস্রোতা এই নদীপথে ধান, পাটসহ নানা পণ্য পরিবহন হতো। নদীকেন্দ্রিক গড়ে উঠেছিল হাট-বাজার ও জনপদ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দখল ও দূষণের কবলে পড়ে সেই জৌলুস হারিয়েছে কাঁচামাটিয়া।
স্থানীয় বাসিন্দা চাঁন মিয়া বলেন, “আগে নদীতে বড় বড় পালতোলা নৌকা চলত, ব্যবসা-বাণিজ্য হতো জমজমাট। এখন চর জেগে ওঠায় বড় নৌকা আর দেখা যায় না।”
আরেক বাসিন্দা কামরুল হাসান অভিযোগ করেন, “মানুষের লোভেই নদীটি ধ্বংস হয়েছে। দখলের কারণে এটি এখন খালে পরিণত হয়েছে। নদীর গুরুত্ব আমরা তখনই বুঝব, যখন এটি পুরোপুরি হারিয়ে যাবে।”
সাইফুল ইসলাম জানান, একসময় এই নদীতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। “আমাদের বাপ-দাদারা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এখন সেই মাছ তো দূরের কথা, নোংরা পানিতে কোনো প্রাণীর অস্তিত্বই নেই,” বলেন তিনি।
স্থানীয় কৃষকরাও নদীর বর্তমান অবস্থায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তাদের মতে, আগে বন্যার পানিতে জমিতে পলি পড়ে উর্বরতা বাড়ত। এখন নদীতে পানি না থাকায় এবং দূষণের কারণে সেই সুযোগও নেই। অনেকেই অভিযোগ করেন, নদীর দূষিত পানিতে চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
পৌর শহরের বাসিন্দা রাসেল মিয়া জানান, পৌরসভার সব ধরনের বর্জ্য নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে এবং মানুষ শ্বাসকষ্টসহ নানা রোগে ভুগছে।
এ বিষয়ে ঈশ্বরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক সালাউদ্দিন বিশ্বাস বলেন, “পৌর বর্জ্য ফেলার নির্দিষ্ট জায়গার অভাবে নদীতে ফেলা হচ্ছে। তবে হারুয়া এলাকায় একটি ডাম্পিং স্টেশন স্থাপনের প্রক্রিয়া চলছে। এটি হলে নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করা সম্ভব হবে।”
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা রহমান জানান, নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। “নদীর জমি পরিমাপ করে অবৈধ দখল উচ্ছেদ করা হবে। এছাড়া নদী পুনঃখননের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে চিঠি দেওয়া হয়েছে,” বলেন তিনি।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাস নয়—দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে কাঁচামাটিয়া নদীকে পুনরুজ্জীবিত করা হবে, যাতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা পায় এবং এলাকার মানুষ আবারও এই নদীর সুফল ভোগ করতে পারে।
১৬৩ বার পড়া হয়েছে