সর্বশেষ

সারাদেশ

মানিকগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার, মানিকগঞ্জ
স্টাফ রিপোর্টার, মানিকগঞ্জ

বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৬ ৩:২২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীনের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি, কেনাকাটায় অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. আমীর হামজা পিন্টু। অভিযোগে সরকারি অর্থ ব্যয়ে কেনাকাটা, টেন্ডার প্রক্রিয়া ও বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির বিষয় তুলে ধরে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।

মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে বিভিন্ন অর্থবছরে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য সামগ্রী কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুদকে দায়ের করা অভিযোগ এবং এর সঙ্গে সংযুক্ত নথিপত্র বিশ্লেষণে এসব অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।

অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে হাসপাতালের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ (এমএসআর) সামগ্রী নতুন করে কেনা না হলেও পুরোনো সামগ্রী রং করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে। একইভাবে ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে পরিচ্ছন্নতা ও মনিহারি সামগ্রী কেনার নামে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় জনগণের পক্ষে মো. আমীর হামজা পিন্টু দুদকে লিখিত অভিযোগ দায়েরের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং দুদক চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগের অনুলিপি পাঠিয়েছেন। অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম করে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে পছন্দের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স সাজনিন এন্টারপ্রাইজকে কাজ পাইয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি অফিসের গিয়াস উদ্দিনকে দিয়ে বিভিন্ন মালামাল কেনাকাটা করে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়া এবং হাসপাতালের প্রধান ফটক বন্ধ রাখার অভিযোগও উঠেছে তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে।

চিকিৎসাসেবার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে গত ৭ অক্টোবর হাসপাতাল প্রাঙ্গণে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত টেন্ডার নথি বিশ্লেষণে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিভিন্ন সামগ্রী কেনাকাটায় বিপুল অর্থ বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।

নথিতে বিভিন্ন আকার ও রঙের ময়লা ফেলার পাত্র (বিন) কেনার জন্য ১৪ লাখ ৮৯ হাজার ৪৫০ টাকা ব্যয়ের উল্লেখ রয়েছে। তবে সরেজমিনে হাসপাতালে এসব পাত্রের সংখ্যা তুলনামূলক কম দেখা গেছে বলে অভিযোগকারীর দাবি।

এ ছাড়া ১ হাজার ৭৫০ ভিএ ক্ষমতার আইপিএস ও ফিটিংস কেনার জন্য ৩ লাখ ৭১ হাজার ২৫০ টাকা, বিভিন্ন আকারের রেফ্রিজারেটর কেনার জন্য ১৮ লাখ ২২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ১০টি স্প্লিট এসি কেনার জন্য ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা বরাদ্দের তথ্য রয়েছে।

ঘাস কাটার মেশিন ও ফটোকপি মেশিন কেনার জন্য বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ২১ লাখ ৯২ হাজার ৫০০ টাকা। অভিযোগকারীর দাবি, আগের দুই অর্থবছরের বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি দাম দেখিয়ে এসব কেনাকাটার মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের তথ্য জানতে চাইলে হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক লিখিতভাবে তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করার পরামর্শ দেন।

নথিপত্রে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ ও বিল প্রদর্শনের তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ওষুধ খাতে ৬ কোটি ৮৮ লাখ টাকা, কেমিক্যাল ও রি-এজেন্ট খাতে ১ কোটি ৭৮ লাখ ৩৭ হাজার ৪০০ টাকা এবং স্ট্যাম্প ও সিল খাতে ১ লাখ ৯৪ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া মনিহারি খাতে ৭২ লাখ ৭০ হাজার ১০০ টাকা, পরিচ্ছন্নতা খাতে ৯৭ লাখ ৪৯ হাজার ৮০০ টাকা এবং মোটরযান মেরামত খাতে ৭ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ টাকার বিলের তথ্য রয়েছে।

অভিযোগ সংশ্লিষ্ট নথিতে এসব খাতে মোট প্রায় ১০ কোটি ৪৬ লাখ ৮ হাজার ৯৭৪ টাকার বিল প্রস্তুত এবং এর মধ্যে কিছু অর্থ উত্তোলনের তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব ব্যয়ের বাস্তবতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

দুদকে অভিযোগকারী মো. আমীর হামজা পিন্টু বলেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীন দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মে জড়িত। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময় আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় বাধা দেওয়া এবং তাঁর নির্দেশে হাসপাতালের প্রধান ফটক বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা জেলার মানুষ জানেন।

তিনি বলেন, পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। এসব অনিয়মের প্রতিবাদ করায় তাঁকে মানসিক চাপের মুখে পড়তে হয়েছে। জনস্বার্থে প্রমাণসহ দুদকে অভিযোগ করলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখতে পাননি তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে মেসার্স সাজনিন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মিলন হোসেন বলেন, ই-জিপি প্রক্রিয়ায় কোনো কাগজপত্র পরিবর্তন বা টেম্পারিং করে আবেদন করার সুযোগ নেই। তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মী অভিযোগ করেন, তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবেদন প্রকাশ হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেই তিনি দায়িত্ব পালন করছেন বলে তাঁদের দাবি।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মানিকগঞ্জ জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) দেওয়ান মো. মিজানুর রহমান বলেন, সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে যে কেউ দুদকের হটলাইন বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে দুর্নীতির অভিযোগ জানাতে পারেন।

তিনি বলেন, অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে দুদক তদন্তের মাধ্যমে মামলা দায়ের, আসামি গ্রেপ্তার এবং প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মামলাটি বিচারের জন্য বিশেষ জজ আদালতে পাঠায়।

মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. বাহাউদ্দীন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন।

অভিযোগে উল্লেখ করা অর্থবছরের বিল ও ওয়ার্কশিট সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এসব তথ্য পেতে হলে দাপ্তরিকভাবে আবেদন করতে হবে। তবে আবেদন করলেই কাঙ্ক্ষিত তথ্য পাওয়া যাবে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট কোনো নিশ্চয়তা দেননি।

তথ্য অধিকার আইনের বিধান উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আইন অনুযায়ী কিছু তথ্য প্রকাশযোগ্য, আবার কিছু তথ্য গোপনীয় হওয়ায় সরবরাহ করা যায় না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ কেনাকাটায় কোটি টাকার ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে দুর্নীতির অভিযোগের বিষয়টি তিনি শুনেছেন।

তিনি বলেন, এসব অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে। তথ্য অধিকার আইনের অপব্যবহার করে দুর্নীতি ও অপরাধ আড়াল করার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।

সরকারি অর্থের অপচয় রোধ এবং জনগণের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

১৩৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০