বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়
৫৩তম জাতীয় গ্রীষ্মকালীন স্কুল হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতা
শনিবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৬ ৪:৩৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়া সদর উপজেলার (ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থানা) উজানগ্রাম ইউনিয়নের বিখ্যাত ও ঐতিহ্যবাহী দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় আরও একটি অবিস্মরণীয় সাফল্য পেয়েছে।
এবার দুর্বাচারার মেয়েরা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) অধীনে ‘বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতি’র ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন প্রতিযোগিতায় বালিকা হ্যান্ডবলে জাতীয় পর্যায়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন অর্থাৎ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) কুমিল্লার ইস্পাহানী ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ মাঠে নিজেদের শেষ গ্রুপ ম্যাচে গোলাপ অঞ্চলের (খুলনা ও বরিশাল বিভাগ নিয়ে গঠিত ) হয়ে দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় ৩২-৩ গোলের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ নিয়ে গঠিত পদ্ম অঞ্চলকে। পদ্ম অঞ্চলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মানকোন উচ্চ বিদ্যালয়। এই জয়ে লিগ ভিত্তিতে হওয়া তিন ম্যাচের সবকটিতেই বিশাল জয়ে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরবে ভেসেছে দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। পদ্ম অঞ্চলের বিপক্ষে দুর্বাচারার হয়ে সর্বোচ্চ ৮টি করে গোল করেন তাহসিনা আক্তার ও ফারজানা আক্তার নিধী। এর আগে গত বছর হওয়া ৫২তম আসরেও অপরাজিত বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়।
কুমিল্লার শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে গত ৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতার চূড়ান্ত পর্যায়ের খেলা। কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দেশব্যাপী মাধ্যমিক স্তরের (ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি) শিক্ষার্থীদের এই বৃহত্তম আসরটি অনুষ্ঠিত হয়। শুক্রবার প্রতিযোগিতার সব খেলা শেষ হয়েছে। শনিবার (১০ অক্টোবর) যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক বিজয়ীদের মধ্যে পুরষ্কার বিতরণ করবেন। অন্যান্য খেলাগুলো শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত স্টেডিয়ামে হলেও হ্যান্ডবল হয়েছে ইস্পাহানী ক্যান্টনেমন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজ মাঠে। এর আগে লিগে আগের দুই ম্যাচেও দাপুটে জয় পায় দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রথমে দেশের তিনটি বিভাগ চট্টগ্রাম, সিলেট ও কুমিল্লা (উপ-অঞ্চল) নিয়ে গঠিত বকুল অঞ্চলকে ১৬-১ গোলে উড়িয়ে দেয় গোলাপ অঞ্চলের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করা দুর্বাচারা। এরপর দ্বিতীয় ম্যাচে দেশের তিনটি প্রশাসনিক বিভাগ রাজশাহী, রংপুর ও দিনাজপুর (উপ-অঞ্চল) নিয়ে গঠিত চাঁপা অঞ্চলকে গোলবন্যায় ভাসিয়ে বিধ্বস্ত করে ২৭-১ গোলে।
বাংলাদেশ জাতীয় স্কুল, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষা ক্রীড়া সমিতির নিয়ম অনুযায়ী পুরো দেশকে মোট ৪টি অঞ্চলে (বকুল, চাঁপা, গোলাপ ও পদ্ম) ভাগ করে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের আগে ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগের হয়ে সেরা হয়ে স্কুলগুলো জাতীয় পর্যায়ে অংশগ্রহণের সুযোগ লাভ করে। তৃণমূল থেকে সর্বোচ্চ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিটি শিক্ষা কার্যক্রমে ক্রীড়াকে সরাসরি সম্পৃক্ত করাই এই আয়োজনের লক্ষ্য। এবার অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণভাবে এই প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হয়। যেখানে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত দেশের প্রায় ৩০ হাজার স্কুল, মাদরাসা ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রাথমিকভাবে দাবা, হ্যান্ডবল, সাঁতার এবং কাবাডি—এই চারটি খেলায় অংশ নিয়েছে। সেখান থেকে সারা দেশ থেকে চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হয়ে আসা ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীকে নিয়ে ফাইনাল রাউন্ডের খেলা হয়।
দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হয়ে প্রতিটি ম্যাচেই চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্স প্রদর্শন করেন মোছাঃ জুঁই খাতুন, মোছাঃ সুরাইয়া খাতুন, ইশরাত জাহান রত্না, মোছাঃ মিম খাতুন, মোছাঃ তাহসিনা আক্তার, মোছাঃ মাইমুনা খাতুন, ফারজানা আক্তার নিধী, মোছাঃ লিজা খাতুন, বৈশাখী খাতুন, মোছাঃ করবী, রূদ্রানী দাস, শাফিয়া খাতুন শান্তারা। প্রতিযোগিতার শুরু থেকেই অপ্রতিরোধ্য ছন্দে এগিয়ে চলে খুলনা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করা দুর্বাচারা। প্রথমে দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয় দল উপজেলা পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে কুষ্টিয়া জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। এই সুবাদে কুষ্টিয়া জেলার হয়ে আরও বড় মঞ্চে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করার সুযোগ আসে করবী-বৈশাখীদের। এরপর খুলনায় অনুষ্ঠিত উপ-অঞ্চলের ফাইনালে নড়াইল জেলাকে ২১-২ গোলে উড়িয়ে দিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এই জয়ে খুলনা বিভাগের সেরা হয়ে বিভাগীয় পর্যায় অর্থাৎ অঞ্চল প্রতিযোগিতায় প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে। সেখানে বরিশালে অনুষ্ঠিত ম্যাচে স্বাগতকি বরিশাল বিভাগকে ২০-২ গোলের বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে কুমিল্লায় জাতীয় পর্যায়ে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
জাতীয় পর্যায়েও দুর্বাচারার মেয়েদের চোখ ধাঁধানো পারফরমেন্স অব্যাহত থাকে। এই পর্যায়ে দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয় খুলনা ও বরিশাল বিভাগের সেরা দল হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে। এখানেও একে একে প্রতিদ্বন্দ্বী বিভাগগুলোকে রীতিমতো বিধ্বস্ত করে সবার সেরা হয়েছে খুলনা বিভাগ তথা দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নিজের স্কুলের এমন সাফল্যে দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, শিক্ষক, ছাত্র-ছাত্রীসহ গ্রামের মানুষ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন। দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের এই দলের সাফল্যের নেপথ্য নায়ক ক্রীড়াশিক্ষক মোঃ সাইদুল ইসলাম (সাইদ)। তিনি তিল তিল করে গড়ে তুলেছেন দলটিকে। তাঁর তত্ত্বাবধানে একঝাঁক উদ্যমী মেয়ে অসাধ্য সাধন করে চলেছে। সাইদুল ইসলাম বলেন, ‘আমি মেয়েদের মধ্যে চেষ্টা ও ভাল করার মানসিকতা দেখেছি। সেই থেকে চেষ্টা করে চলেছি। তার ফসল পেয়ে খুব ভাল লাগছে। ওরা যেন বাংলাদেশের হয়ে খেলে দেশের মুখ উজ্জ্বল করতে পারে সেই আশা করি।’ বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক মৌসুমী সুলতানাও মেয়েদের সাফল্যের পেছনে অনন্য অবদান রেখেছেন। তিনি মেয়েদের প্রতিটি সফরের সঙ্গী হয়ে তাদের মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখেন। প্রধান শিক্ষক বিল্লাল হোসেনও মেয়েদের অভিনন্দন জানান।
দুর্বাচারা বহুমুখী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি ও কুষ্টিয়া আদর্শ ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোঃ সালাহ্ উদ্দিন বলেন, ‘এই মেয়েরা আমাদের দুর্বাচারা তথা কুষ্টিয়া জেলার গর্ব। ওরা ক্রিকেটেও জাতীয় পর্যায়ে অসাধারণ সাফল্য পেয়েছে। হ্যান্ডবলেও খুব ভাল করছে। জাতীয় পর্যায়ের এই সাফল্য আমাদের দুর্বাচারা তথা কুষ্টিয়ার জন্য অনেক গৌরবের।’ এর আগে দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা জাতীয় স্কুল ক্রিকেটে জাতীয় পর্যায়ে রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। থানা, জেলা, বিভাগীয় পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে জাতীয় পর্যায়ের ফাইনালে খেলেছে বিদ্যালয়ের বালিকা ক্রিকেট দল। এই দলটিই গত বছর ঢাকার পল্টনে শহীদ (ক্যাপ্টেন) এম. মনসুর আলী জাতীয় হ্যান্ডবল স্টেডিয়াম মাতিয়ে গেছে। ৩৬তম জাতীয় নারী হ্যান্ডবল প্রতিযোগিতায় কুষ্টিয়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার হয়ে প্রতিনিধিত্ব করে দুর্বাচারা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সপ্তম, অস্টম, নবম শ্রেণীতে পড়ুয়া ছোট্ট কিশোরীরা বুক চিতিয়ে লড়াই করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), বাংলাদেশ পুলিশের মতো পেশাদার ও চ্যাম্পিয়ন দলের সঙ্গে। যাদের বেশিরভাগ খেলোয়াড় বাংলাদেশ জাতীয় দলে খেলে থাকেন।
১৩৭ বার পড়া হয়েছে