সর্বশেষ

সারাদেশ

দেড় শত বছরের ঐতিহ্যে দেশজুড়ে বাগাটের দইয়ের সুনাম

আবিদ জামান, ফরিদপুর
আবিদ জামান, ফরিদপুর

রবিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৬:৫৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বাগাট ইউনিয়নের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে দই তৈরির দীর্ঘ ঐতিহ্য। দেড় শতাধিক বছর আগে ঘোষ পরিবারের হাত ধরে শুরু হওয়া এই দইয়ের সুনাম এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়। বাগাটের দই ও মিষ্টির দোকানও গড়ে উঠেছে বিভিন্ন এলাকায়। স্থানীয়দের ভাষায়, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, সুন্নতে খতনা কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের খাবারের শেষে বাগাটের দই যেন চাই-ই চাই।

ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার একটি ইউনিয়নের নাম বাগাট। আর এই নামেই পরিচিত বাগাটের দই। দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও স্বাদের কারণে এই দইয়ের খ্যাতি এখন বাগাটের সীমানা ছাড়িয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা ও ফরিদপুরসহ বিভিন্ন জেলায় পাওয়া যায় বাগাটের দই। এরই মধ্যে কয়েকটি জেলায় বাগাটের দই ও মিষ্টির প্রায় অর্ধশতাধিক দোকান গড়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বাগাটের ঘোষ পরিবারের মাধ্যমে দেড় শতাধিক বছর আগে দই তৈরির প্রচলন শুরু হয়। বাগাট থেকে দই তৈরি করে পরিবহনের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়। আবার ঘোষ পরিবারের অনেকেই বিভিন্ন এলাকায় বসতি গড়ে সেখানে দই তৈরি ও বিক্রি করছেন। তবে বাগাট বাজারের নিতাই চন্দ্র ঘোষের দোকানের দই এখনো অনেকের পছন্দের তালিকায় রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বিয়ে, অন্নপ্রাশন, সুন্নতে খতনা কিংবা অন্য কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে মাছ, মাংস, কুমড়া-পোলাও, কাচ্চি বা বিরিয়ানি—যে খাবারই থাকুক, শেষে বাগাটের দই রাখার প্রচলন রয়েছে। আয়োজকেরাও অতিথিদের নানা ধরনের খাবারের পর দই দিয়ে আপ্যায়ন শেষ করতে চান। এভাবেই বাগাটের দই ও মিষ্টির সুনাম স্থানীয় গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।

বাগাট এলাকার ঘোষ সম্প্রদায় শতাধিক বছর আগে দই ও মাঠা তৈরির কাজ শুরু করে। ভারত ভাগের পর পাকিস্তান আমলে খ্যাতিমান দই প্রস্তুতকারী নিরাপদ ঘোষের হাত ধরে বাগাটের দই আরও পরিচিতি পায়। তাঁর তৈরি দই পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের পাশাপাশি পশ্চিম পাকিস্তানের করাচি, রাওয়ালপিন্ডিসহ বিভিন্ন শহরেও যেত। বর্তমানে নিরাপদ ঘোষের পরিবারের কেউ এই ব্যবসায় নেই। তবে বাগাটের প্রায় ২০টি পরিবার এখনো দই তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, বর্তমানে সুনীল ঘোষ বাগাটের দই তৈরির ঐতিহ্য ধরে রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।

বাগাটের সুভাষ ঘোষ বলেন, বাগাটের দই জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ এর স্বাদ। দই ভালোভাবে জমে এবং মিষ্টিও হয়। এ ছাড়া এলাকায় খাঁটি গাভির দুধ সহজলভ্য।

স্থানীয় জগদীশ ঘোষ জানান, বাগাট এলাকায় প্রচুর খাঁটি দুধ পাওয়া যায়। দই তৈরির জন্য দুধ থেকে ক্রিম তুলে নেওয়া হয় না। এ কারণে দই ও মিষ্টি ভালো মানের হয়।

সুমিতা ঘোষ বলেন, দই তৈরিতে দুধ কয়েকবার জ্বাল দিতে হয়। প্রথম দিন কয়েকবার জ্বাল দিয়ে দুধ রেখে দেওয়া হয়। পরের দিন আবার কয়েকবার জ্বাল দেওয়ার পর দই পাতানো হয়। এখানে মিষ্টি দই, টক দই, হালকা মিষ্টি দই ও ক্ষীরসা দইসহ বিভিন্ন ধরনের দই তৈরি হয়। গরমকালে বাগাটের দই তিন দিন এবং শীতকালে সাত দিন পর্যন্ত ফ্রিজে না রেখেও খাওয়া যায়।

তিনি আরও জানান, দই তৈরিতে দইয়ের বীজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বীজ তৈরির ওপরই দইয়ের স্বাদের অনেকটা নির্ভর করে। আড়াই কেজি বীজ দিয়ে শীতকালে আড়াই মণ এবং গরমকালে পাঁচ মণ পর্যন্ত দই তৈরি করা হয়।

দই পাতানোর প্রক্রিয়া সম্পর্কে সুনীল ঘোষের ভাগ্নে প্রদীপ ঘোষ বলেন, প্রথমে দুধ জ্বাল দিয়ে ঠান্ডা করতে হয়। এরপর নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পরিমাণমতো বীজ দিয়ে দুধ ঢেকে রাখা হয়। কিছু সময় পর তা মাটির হাঁড়িতে ঢেলে প্রায় আট ঘণ্টা ঢেকে রাখলে দই প্রস্তুত হয়।

বাগাট বাজারের অন্যতম দই বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিতাই ঘোষের ছেলে নিরঞ্জন ঘোষ বলেন, তাঁরা বংশপরম্পরায় দই ও মিষ্টির ব্যবসা ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। দই ও মিষ্টি তৈরিতে তাঁদের প্রতিদিন ৩ থেকে ৫ মণ দুধ প্রয়োজন হয়। দুধ জ্বাল দেওয়ার পর এর বেশির ভাগই দই তৈরিতে ব্যবহার করা হয়।

নিরঞ্জন ঘোষ জানান, প্রতি কেজি দই ১৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়। এ ছাড়া কালোজাম ও চমচম ২২০ থেকে ২৫০ টাকা কেজি এবং ছানার সন্দেশ ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে ক্রেতারা দই ও মিষ্টি কিনে নিয়ে যান। পরিবহনে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব পণ্য যায়। এ মহাসড়ক দিয়ে যাতায়াতের সময় অনেকে ভারতের কলকাতাসহ বিভিন্ন প্রদেশেও বাগাটের দই ও মিষ্টি নিয়ে যান।

বাগাট ইউনিয়ন পরিষদের সাত্তার মিয়া জানান, বাগাটে প্রায় ২৫টি পরিবারের শতাধিক নারী-পুরুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দই তৈরির সঙ্গে জড়িত। বাগাটের দই দেশের বিভিন্ন স্থান ছাড়াও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে যায় এবং এর যথেষ্ট সুনাম রয়েছে।

বাগাট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মতিয়ার রহমান বলেন, ঘোষগ্রামের মানুষ দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ায় বাগাটের দইও বিভিন্ন এলাকায় পরিচিতি পেয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ও পরে সত্যচরণ ঘোষ নামের এক ব্যক্তি চারবার এই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। বাগাটের দই জনপ্রিয় করার পেছনে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল।

মো. মতিয়ার রহমান জানান, তাঁর উদ্যোগে ১৯৭৭ সালে বাগাটে একটি পশু প্রজননকেন্দ্র গড়ে ওঠে। উন্নত জাতের গাভি উৎপাদন ও তা পালনে সহযোগিতা করাই ছিল এ কেন্দ্রের লক্ষ্য। বর্তমানে বাগাট এলাকায় ছোট-বড় অর্ধশতাধিক গরুর খামার রয়েছে। এসব খামারের দুধই দই তৈরির অন্যতম প্রধান উপকরণ।

দইয়ের পাশাপাশি বাগাটে খাঁটি দুধের তৈরি বিভিন্ন ধরনের মিষ্টিও পাওয়া যায়। এর মধ্যে রয়েছে ছানার চমচম, মালাইকারী, ছোট চমচম, শর মালাই, দুধ মালাই, সাগর ভোগ, জাফরান লাড্ডু, ছানার পোলাও, স্পঞ্জ রসগোল্লা, কাজু সন্দেশ, ছানার অমিত্তি, কালোজাম, শুকনা রসগোল্লা, বরফি সন্দেশ, বাদাম বরফি, কাঁচা গোল্লা, প্যারা সন্দেশ, রস চমচম, মালাই রোস্ট, দই ও রসমালাই। সব মিলিয়ে এখানে প্রায় ৩০ ধরনের খাঁটি দুধের উন্নতমানের মিষ্টি পাওয়া যায়। 

১০৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০