সর্বশেষ

জাতীয়

গ্যাস সংকটে ভারী শিল্পে উৎপাদন বন্ধ, চাপে পোশাক ও ভোগ্যপণ্য খাত

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬ ৫:০২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
দেশে টানা প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে তীব্র গ্যাস সংকটে শিল্প উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাস ও এলএনজি সরবরাহ কমে যাওয়ায় স্টিল, সিমেন্ট, কাচ, সিরামিক ও বস্ত্রসহ গ্যাসনির্ভর শিল্পের অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলোর কয়েকটি কারখানা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে, আবার অনেক কারখানা চলছে সীমিত সক্ষমতায়। এতে রপ্তানি আয়, স্থানীয় বাজারে পণ্য সরবরাহ ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে ভারী ও গ্যাসনির্ভর শিল্পে। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্প এলাকায় অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কোথাও আংশিকভাবে উৎপাদন চলছে, আবার কোথাও মেশিন বন্ধ রেখে শ্রমিকদের কর্মস্থলে অপেক্ষা করতে হচ্ছে।

শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাসের পাশাপাশি বিদ্যুৎ সংকটও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করা হলেও এতে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। ফলে দীর্ঘ সময় এভাবে কারখানা চালানো অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

মেঘনা গ্রুপের কারখানাগুলো বন্ধ
শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী মেঘনা গ্রুপের সব মিল-কারখানা গত বুধবার থেকে বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোস্তফা কামাল। তাঁর ভাষ্য, উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার মতো ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে না। এর সঙ্গে নতুন করে বিদ্যুৎ সংকটও যুক্ত হয়েছে।

মোস্তফা কামাল জানান, উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, উৎপাদন বন্ধ থাকলেও সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের চাহিদা অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহব্যবস্থায়ও বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।

মেঘনা গ্রুপ ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, সুজি, চিনি, সিমেন্ট, পেপার, এলপিজি, ফিড ও কেমিক্যালসহ বিভিন্ন পণ্য উৎপাদন করে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, দেশের বিপুলসংখ্যক পরিবারের কাছে তাদের পণ্য পৌঁছে যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন দেশে এসব পণ্য রপ্তানিও করা হয়।

টি কে গ্রুপের পরিচালক মোস্তাফিজুর রহমান জানিয়েছেন, তাদের কেমিক্যাল, ভোজ্যতেল ও সিমেন্ট কারখানাগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও গজারিয়ায় থাকা কারখানাগুলোতে দুই দিনের বেশি সময় ধরে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে বলে তিনি জানান।

গ্যাসের সীমিত সরবরাহ কীভাবে বিভিন্ন খাতে বণ্টন করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শিল্প উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, সার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি শিল্প খাতেও ন্যূনতম প্রয়োজনীয় গ্যাস নিশ্চিত করা জরুরি।

আরএফএল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আর এন পাল জানান, গ্যাস সংকটের কারণে তাদের কারখানাগুলোর উৎপাদন প্রায় ৫০ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে তাদের উৎপাদনের বড় অংশ সম্পন্ন হয়। এসব এলাকায় গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় কারখানাগুলোতে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে।

বিকল্প হিসেবে ডিজেল বা অন্যান্য উৎসের বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে বলে জানান তিনি। প্লাস্টিক, পিভিসি পাইপ, ফুটওয়্যার ও ইলেকট্রনিকস পণ্যের উৎপাদনে এর প্রভাব বেশি পড়ছে।

হবিগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে বড় শিল্পগোষ্ঠীর ১৭১টি কারখানা রয়েছে। গত বুধবার থেকে এসব কারখানায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাপকভাবে ব্যাহত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এতে বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কর্মহীন সময় পার করছেন।

গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। শিল্প পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জেলা ও মহানগর এলাকায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার শিল্পকারখানা রয়েছে। এর মধ্যে গ্যাস সংকটের কারণে প্রায় ১২ থেকে ১৫ শতাংশ কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। এ হিসাবে বন্ধ কারখানার সংখ্যা প্রায় ৫২৫।

বড় কিছু কারখানা বিকল্প ব্যবস্থায় উৎপাদন চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সেসব প্রতিষ্ঠানেও উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শিল্প এলাকায় কোথাও মেশিন বন্ধ, কোথাও সীমিত পরিসরে উৎপাদন চলছে। কিছু কারখানায় শ্রমিকদের ছুটিও দেওয়া হয়েছে।

গ্যাসের সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যাও যুক্ত হওয়ায় তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাতের উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। উদ্যোক্তাদের সংগঠনগুলোর ভাষ্য, অনেক কারখানায় উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।

বিশেষ করে ডাইং, ফিনিশিং, স্ট্যান্টিং ও সাইজিংয়ের মতো গ্যাসনির্ভর প্রক্রিয়াগুলো চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। স্পিনিং কারখানাগুলোতে গ্যাসচালিত চিলার বন্ধ থাকায় তাপমাত্রা বেড়ে উৎপাদিত সুতার মানেও প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করে উৎপাদন চালু রাখলে ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। বড় একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন হওয়ায় এই অতিরিক্ত ব্যয় দীর্ঘদিন বহন করা কঠিন।

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বাসাবাড়িতেও সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এর ফলে শিল্পসহ অন্যান্য খাতে গ্যাসের প্রাপ্যতা কমেছে।

তিন সপ্তাহ আগে শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে যে পরিমাণ গ্যাস সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজিচালিত যানবাহনেও। গ্যাস না পাওয়ায় জামালপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালকেরা সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন। এতে সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা দুর্ভোগে পড়েন।

শিল্প উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, দ্রুত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা না গেলে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি পণ্য সরবরাহব্যবস্থা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাঁদের মতে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখতে জ্বালানি সরবরাহে দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন।

১৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন