আবাসন খাতের সংকটে অর্থনীতিতে শ্লথতা, নীতি সহায়তার দাবি ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের
মঙ্গলবার, ১৬ জুন, ২০২৬ ৫:২৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের অন্যতম চালিকাশক্তি আবাসন খাত বর্তমানে গভীর মন্দার মুখে পড়েছে। ফ্ল্যাট বিক্রি কমে যাওয়া, নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ সুদের হার—সব মিলিয়ে খাতটি স্থবির হয়ে পড়েছে বলে জানিয়েছেন আবাসন ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, দ্রুত নীতি সহায়তা না দিলে এই সংকট জাতীয় অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবাসন খাতকে কেন্দ্র করে দেশের প্রায় ২০০টির বেশি লিংকেজ শিল্প—যেমন রড, সিমেন্ট, সিরামিক, গ্লাস, পেইন্ট, আসবাব ও বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম—নির্ভরশীল। ফলে এই খাতের যেকোনো মন্দা সরাসরি বিস্তৃত শিল্প খাতেও ধাক্কা দেয়।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাত দীর্ঘ সময় সংকটে থাকলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হবে। বর্তমানে ফ্ল্যাট বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে বলে দাবি করেছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সভাপতি আলী আফজাল বলেন,
“বর্তমানে নিবন্ধন ব্যয় ১৩ শতাংশের বেশি হওয়ায় আবাসন ক্রয়-বিক্রয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে। এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশেই এই ব্যয় সবচেয়ে বেশি। এটি কমিয়ে ৭ শতাংশে আনার প্রস্তাব দেওয়া হলেও বাজেটে তার প্রতিফলন নেই।”
তিনি আরও বলেন, “নির্মাণসামগ্রীর দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় প্রতি বর্গফুট নির্মাণ ব্যয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে মধ্যবিত্ত ক্রেতারা বাজার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।”
এডিসন রিয়েল এস্টেটের অতিরিক্ত পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, “বর্তমানে একটি ফ্ল্যাট নির্মাণে খরচ ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ বেড়ে গেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকঋণের সুদের হার ১৫ থেকে ১৬ শতাংশে পৌঁছানোয় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও বিক্রি দুটোই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।”
তিনি আরও জানান, “ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক প্রকল্প ধীরগতিতে চলছে। নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়ার ঝুঁকি নিতে পারছেন না অনেক ডেভেলপার।”
অর্থনীতিবিদ ও ফিন্যানশিয়াল এক্সিলেন্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান মামুন রশীদ বলেন, “আবাসন খাতকে আমরা ‘রিয়েল সেক্টর’ হিসেবে দেখি, কারণ এটি সামষ্টিক অর্থনীতির গতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে ফ্ল্যাট বিক্রির পতন অর্থনীতির স্থবিরতার একটি বড় সংকেত।”
তিনি আরও বলেন, “নির্মাণসামগ্রীর দাম, উচ্চ সুদহার এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে এই খাতে বিনিয়োগ কমে গেছে। দ্রুত নীতি সহায়তা না দিলে এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়বে।”
রিহ্যাবের তথ্যানুযায়ী, কয়েক বছর আগে যেখানে মাসে প্রায় এক হাজার ফ্ল্যাট বিক্রি হতো, এখন তা ৫০০-তে নেমে এসেছে। বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের বিক্রি ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
রাজধানীর বাংলামোটর এলাকার এক টাইলস ব্যবসায়ী জানান, “আগে দৈনিক তিন থেকে চার লাখ টাকার বিক্রি হতো, এখন অনেক দিন ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকাও হয় না। ব্যাংকের কিস্তি ও ভাড়া দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।”
অন্যদিকে, আবাসন খাতের উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট ও ব্যাংক সুদের চাপ এই খাতকে দুর্বল করে দিয়েছে। অনেক জমির মালিকও ফ্ল্যাট ডেভেলপারদের সঙ্গে চুক্তিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন।
আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ তানভীরুল ইসলাম বলেন, “একীভূত নীতি, স্বচ্ছতা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে আবাসন খাত আবারও দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখতে পারবে।”
তিনি আরও বলেন, “এই খাত শুধু ডেভেলপারদের নয়, প্রকৌশলী, স্থপতি, শ্রমিক এবং বহু পেশাজীবীর জন্য বড় কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন খাতে বিনিয়োগ বাড়লে এর গুণক প্রভাব (multiplier effect) অর্থনীতিতে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। রিহ্যাবের হিসাব অনুযায়ী, এই খাতে বিনিয়োগের প্রতিটি টাকা অর্থনীতিতে ২.৫ গুণ প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, উন্নত দেশগুলোতে আবাসন খাত জিডিপির ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখে, যেখানে বাংলাদেশে এই হার তুলনামূলকভাবে কম এবং সংকটের কারণে আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সময়মতো নীতি সহায়তা না দিলে আবাসন খাতের সংকট শুধু ব্যবসায়িক ক্ষতি নয়, বরং কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধস ডেকে আনতে পারে।
১৩২ বার পড়া হয়েছে