সুন্দরবনে প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা, চালু থাকবে করমজল পর্যটন কেন্দ্র
সোমবার, ১ জুন, ২০২৬ ৫:৪৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন-এ জীববৈচিত্র ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় আজ ১ জুন থেকে আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত টানা তিন মাস সব ধরনের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে বন বিভাগ। এ সময় জেলে, বাওয়ালী, মৌয়াল, গোলপাতা সংগ্রহকারী এবং দেশি-বিদেশি পর্যটক—কারও জন্যই বনের ভেতরে প্রবেশের অনুমতি থাকবে না।
তবে দীর্ঘদিন পর ব্যতিক্রম হিসেবে এবার শুধু করমজল বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র ও পর্যটন স্পট উন্মুক্ত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করমজল এলাকাটি পশুর নদীর তীরে হওয়ায় এটি তুলনামূলকভাবে সংরক্ষিত ও সীমিত পরিসরের পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনের অধিকাংশ মাছ, কাঁকড়া, চিংড়ি, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীর প্রধান প্রজনন মৌসুম। এ সময়ে মানুষের অবাধ প্রবেশ ও কার্যক্রম বন্ধ না করলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জীববৈচিত্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ বলেন, প্রজনন মৌসুমে নদী-খালগুলো মাছের ডিম ছাড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে কাজ করে। পাশাপাশি এ সময় উদ্ভিদের বীজ অঙ্কুরোদ্গম ও নতুন চারা জন্মের জন্যও উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়।
তিনি আরও জানান, নৌযান চলাচল, মাছ ধরা, শব্দদূষণ ও পর্যটকের ভিড় বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক আচরণে বাধা সৃষ্টি করে। তাই নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করতেই তিন মাসের এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
নিষেধাজ্ঞা চলাকালে কোনো ধরনের পাস বা পারমিট ইস্যু করা হবে না বলেও জানিয়েছে বন বিভাগ। কেউ অবৈধভাবে বনে প্রবেশ করলে বন আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সময় কোস্ট গার্ড, নৌ পুলিশ ও বন বিভাগের যৌথ টহল ও নজরদারি জোরদার থাকবে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে ঘিরে সুন্দরবন-নির্ভর হাজারো পরিবার উদ্বেগে রয়েছে। তাদের দাবি, তিন মাস জীবিকা বন্ধ থাকায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং অনেকেই ঋণ-দেনার ফাঁদে জড়িয়ে যান। বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা ও সরকারি খাদ্য সহায়তার দাবি জানিয়েছেন তারা।
অন্যদিকে পরিবেশবিদরা মনে করছেন, সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে স্থানীয়ভাবে কিছু অসাধু চক্রের কারণে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর হয় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ আন্দোলনের প্রতিনিধিরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও সম্পদ হ্রাসের কারণে বননির্ভর মানুষের আয় ইতিমধ্যে কমে গেছে। তাই বন সুরক্ষার পাশাপাশি তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সহায়তা কর্মসূচি জরুরি হয়ে উঠেছে।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে শতাধিক প্রজাতির মাছ, কাঁকড়া ও বন্যপ্রাণী রয়েছে। এই বিশাল জীববৈচিত্র রক্ষায় প্রতি বছর নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানব প্রবেশ সীমিত করার এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে পরিবেশ রক্ষার স্বার্থে কঠোর এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে এখনো মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে উপকূলীয় এলাকায়।
৪৩৬ বার পড়া হয়েছে