৫ জন হত্যা: সন্তান-নাতি হারিয়ে গোপালগঞ্জে মায়ের আহাজারি
শনিবার, ৯ মে, ২০২৬ ১২:৩৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একই পরিবারের পাঁচজনকে গলা কেটে হত্যার ঘটনায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে গোপালগঞ্জে নিহতদের পরিবারে। নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা।
সন্তান ও নাতি-নাতনিদের হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন ফিরোজা বেগম (৬০)। বুক চাপড়ে বিলাপ করে তিনি বারবার বলছিলেন, “আমার বাবারে মাইরা ফ্যালাইছে। আমার কলিজার ধনডারে শেষ কইরা দিল। আমি এখন কী নিয়ে বাঁচবো রে আল্লাহ...।”
পরিবারের অভিযোগ, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জের ধরে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালককে গলা কেটে হত্যা করেছেন ফোরকান মোল্লা।
ঘটনার পর নিহতদের মরদেহের পাশে গোপালগঞ্জ সদর থানায় দায়ের করা একটি অভিযোগপত্রের কপি পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আনিসুর রহমান জানান, এমন কোনো অভিযোগ বা জিডি থানায় করা হয়নি।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার পাইককান্দি ইউনিয়নের শাহাদাত মোল্লা ও ফিরোজা বেগম দম্পতির সাত সন্তানের মধ্যে শারমিন আক্তার ছিলেন তৃতীয় এবং রসুল মোল্লা ছিলেন সবার ছোট। তাদের বড় মেয়ে বিয়ের কয়েক বছর পর অসুস্থতায় মারা যান।
প্রায় ২০ বছর আগে গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বাসাবাড়ি গ্রামের আতিয়ার মোল্লার ছেলে ফোরকান মোল্লার সঙ্গে সামাজিকভাবে বিয়ে হয় পাইকান্দি উত্তর চরপাড়া গ্রামের শারমিন আক্তারের। বিয়ের পর কয়েক বছর শ্বশুরবাড়িতে থাকার পর দাম্পত্য কলহ শুরু হয়। পরে ফোরকান স্ত্রীকে নিয়ে প্রথমে ঢাকায় এবং ছয় মাস আগে গাজীপুরের কাপাসিয়ায় বসবাস শুরু করেন। সেখানে তিনি প্রাইভেটকার চালিয়ে সংসার চালাতেন।
এদিকে, রসুল মোল্লা গাজীপুরে একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন এবং বড় বোন ফাতেমা বেগমের বাসায় থাকতেন। প্রায় এক বছর আগে পারিবারিক কলহের কারণে শারমিন বাবার বাড়িতে চলে আসেন। পরে ফোরকান শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে বুঝিয়ে স্ত্রী ও সন্তানদের আবার নিজের কাছে নিয়ে যান।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার ফোরকান মোল্লা চীনা একটি কোম্পানিতে চাকরির কথা বলে শ্যালক রসুল মোল্লা ও ভাগনে রকিবকে তার ভাড়া বাসায় যেতে বলেন। তবে রসুল গেলেও রকিব গোপালগঞ্জে ফিরে আসেন।
শনিবার ভোরে গাজীপুরের কাপাসিয়ার রাউৎকোনা এলাকায় ফোরকানের ভাড়া বাসা থেকে স্ত্রী, তিন সন্তান ও শ্যালকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহতরা হলেন—শারমিন আক্তার (৩০), তার ভাই রসুল মোল্লা (১৮), এবং শারমিনের তিন মেয়ে মিম আক্তার (১৪), হাবিবা (১০) ও ফারিয়া (২)।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফিরোজা বেগম বলেন, “আমার বাজান গতকাল নতুন জামা-প্যান্ট কিনছে। সেই জামা পরে হাসতে হাসতে বোনের বাসায় গেছে। কে জানত, ওই যাওয়াই শেষ যাওয়া! আমার রসুল আমার ছোট ছেলে, আমার বুকের ধন। তোরা আমার রসুলরে আইনা দে...” এ কথা বলেই তিনি বারবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পাশে থাকা স্বজনরা তাকে সামলানোর চেষ্টা করেন।
নিহত শারমিন ও রসুলের চাচা খবির মোল্লা বলেন, “বাবা-মায়ের সামনে সন্তানদের মেরে ফেললে তারা কিভাবে বেঁচে থাকে? আমার ভাই গ্রাম পুলিশ (চৌকিদার)। অনেক কষ্ট করে সন্তানদের বড় করেছে। রসুল গাজীপুরে গার্মেন্টসে চাকরি করত। গতকাল রাত ৮টার পর থেকে তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। আমরা ভেবেছিলাম চার্জ শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি আরও জানান, শনিবার ভোর সাড়ে ৫টার দিকে ফোরকান মোল্লার ভাই জব্বার মোল্লা ফোন করে জানান, শারমিনের বাসার সবাই মারা গেছে। কীভাবে মারা গেছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ফোরকান ফোনে জানিয়েছে—“পরিবারের সবাইকে শেষ করে ফেলেছি, আমাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।”
খবির মোল্লা বলেন, “সন্তান পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ। বাবা হয়ে কেউ কীভাবে নিজের সন্তানকে হত্যা করতে পারে? সে মানুষ হতে পারে না। আমরা ওই খুনির সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।”
আইনি প্রক্রিয়া শেষে নিহতদের মরদেহ পাইকান্দি গ্রামে দাফন করা হবে বলে পরিবার জানিয়েছে।
বাদল সাহা
১১২ বার পড়া হয়েছে