হিশামের জামিন হয়নি, অভিযোগ প্রমাণিত হলে হতে পারে মৃত্যুদণ্ড
বুধবার, ২৯ এপ্রিল, ২০২৬ ৭:০৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার (ইউএসএফ) দুই বাংলাদেশি পিএইচডি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির নির্মম হত্যাকাণ্ডে গ্রেপ্তার হওয়া হিশাম সালেহ আবুঘরবেহর জামিন আবেদন নাকচ করেছেন আদালত। একই সঙ্গে তাকে কারাগারে আটক রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ এপ্রিল) হিলসবরো কাউন্টির আদালতের বিচারক লোগান মারফি এ আদেশ দেন। শুনানিতে অভিযুক্তকে ভুক্তভোগীদের পরিবার বা সাক্ষীদের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার নির্দেশও দেওয়া হয়। যদিও ওই সংক্ষিপ্ত শুনানিতে আবুঘরবেহ আদালতে উপস্থিত ছিলেন না।
নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের অন্তত ১৫ দিন আগে থেকেই অভিযুক্ত হিশামের আচরণ নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ ছিল। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, ‘হিশামের চরম রাগী ও উগ্র স্বভাব নিয়ে “অ্যাভালন হাইটস” হাউজিং কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি।’
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, লিমন ও তার রুমমেট হিশামের সম্পর্ক ভালো ছিল না। হিশামের অসামাজিক ও অপ্রীতিকর আচরণের কথা লিমন আগেই পরিবার ও বন্ধুদের জানিয়েছিলেন। এমনকি এক ভারতীয় রুমমেটকে সঙ্গে নিয়ে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছিলেন তারা।
জুবায়ের আহমেদ আরও বলেন, ‘আমার ভাই বলত তার রুমমেট কিছুটা “সাইকোপ্যাথ” স্বভাবের। অভিযোগ করার পরও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। যথাযথ ব্যাকগ্রাউন্ড চেক ছাড়াই তাকে রুমমেট হিসেবে দেওয়া হয়েছিল।’
নিহতদের পরিবার আবাসন ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে। তাদের প্রশ্ন:
রুমমেট নির্ধারণের আগে কেন ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা হয়নি?
অভিযোগ পাওয়ার পরও কেন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি?
কেন পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ক্যামেরা ও প্রহরী ছিল না?
এছাড়া তারা অভিযুক্তের সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেছেন এবং মরদেহ ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দাফনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগিতা চেয়েছেন। লিমনের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র দেশে পাঠানো এবং তাদের স্মরণে স্মারক স্থাপনের দাবিও জানানো হয়েছে।
ঘটনার সূত্রপাত চলতি মাসের শুরুতে, যখন লিমন ও বৃষ্টি নিখোঁজ হন। পরে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ থেকে প্লাস্টিকের ব্যাগে লিমনের দেহাংশ উদ্ধার করা হয়। একইভাবে ইন্টারস্টেট-২৭৫ সংলগ্ন জলাশয় থেকে আরেকটি দেহাবশেষ পাওয়া যায়, যা নাহিদা বৃষ্টির বলে ধারণা করা হলেও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত হয়নি।
তদন্তে শেয়ার করা অ্যাপার্টমেন্টে রক্তের দাগ, ফেলে দেওয়া কাপড়সহ বিভিন্ন আলামত পাওয়া গেছে। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে হিশামের গাড়ির গতিবিধি অনুসরণ করে পুলিশ মরদেহের সন্ধান পায়।
আরও জানা যায়, হত্যাকাণ্ডের কয়েকদিন আগে হিশাম আবর্জনার ব্যাগ ও ডাক্ট টেপ কিনেছিলেন এবং ইন্টারনেটে মরদেহ গুম করার উপায় খুঁজেছিলেন।
আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হিশামের আগে থেকেই সহিংস আচরণের ইতিহাস ছিল। এমনকি নিজের পরিবারের সদস্যদের ওপরও তিনি হামলা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার মা তদন্তকারীদের জানিয়েছেন, তার ছেলে চরম রাগী এবং অতীতেও সহিংস আচরণ করেছে।
অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ফার্স্ট ডিগ্রি হত্যা (দুটি), অস্ত্র রাখাসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। দোষী সাব্যস্ত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে প্রসিকিউটররা এখনো জানায়নি তারা মৃত্যুদণ্ড চাইবেন কি না।
আগামী মাসে মামলাটি গ্র্যান্ড জুরির সামনে উপস্থাপন করা হবে এবং চার্জ গঠন করা হবে।
ঘটনার পর ইউএসএফের টাম্পা ক্যাম্পাসে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। শিক্ষার্থীরা নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, বিশেষ করে যারা ক্যাম্পাসের বাইরে বাসা ভাড়া করে থাকেন।
নিহতদের বন্ধুরা জানান, প্রবাসে তারা একে অপরের পরিবারের মতো ছিলেন। বন্ধু রিফাতুল ইসলাম বলেন, ‘বাড়ি থেকে হাজার মাইল দূরে এসে তারাই ছিল আমাদের পরিবার। নিজেদের বাসায় এভাবে খুন হওয়া—এটা মেনে নেওয়া কঠিন।’
আরেক বন্ধু সালমান সাদিক শুভ বলেন, ‘জামিল খুব হাসিখুশি ও নম্র স্বভাবের ছিল, আর নাহিদা ছিল অত্যন্ত অমায়িক।’
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ১৭ এপ্রিল রাত ১টা থেকে ভোর ৫টার মধ্যে হাওয়ার্ড ফ্র্যাঙ্কল্যান্ড ব্রিজ এলাকায় কেউ সন্দেহজনক কিছু দেখে থাকলে পুলিশকে জানাতে।
“অ্যাভালন হাইটস” কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, তারা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে পূর্ণ সহযোগিতা করছে। তবে চলমান তদন্তের কারণে তারা বিস্তারিত কিছু জানাতে রাজি হয়নি।
বর্তমানে লিমনের এক আত্মীয় ফ্লোরিডায় অবস্থান করছেন এবং মরদেহ দেশে পাঠানোসহ আইনি প্রক্রিয়া তদারকি করছেন।
১২৬ বার পড়া হয়েছে