রূপপুরে জ্বালানি লোডিং শুরু, পারমাণবিক বিদ্যুৎ যুগে বাংলাদেশের প্রবেশ
মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:৫৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে অবশেষে জ্বালানি (ফুয়েল) লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করল।
একই সঙ্গে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক অর্জিত হলো। এর ফলে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী দেশের তালিকায় যুক্ত হয়েছে।
সোমবার (২৮ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে তিনটার দিকে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় এক অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ডাক ও টেলিযোগাযোগ, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। স্বাগত বক্তব্য দেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এছাড়া আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হয়ে বক্তব্য রাখেন। উদ্বোধনের আগে প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে একটি প্রামাণ্য ভিডিও প্রদর্শন করা হয়।
মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দ্রুততম সময়ে প্রকল্পটি কমিশনিংয়ের লক্ষ্যে কাজ করা হয়েছে। তিনি জানান, ফিজিক্যাল স্টার্টআপের পর আজ জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া দেশের জন্য একটি গৌরবের মুহূর্ত। বহু বছরের পরিকল্পনা, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সফল বাস্তবায়ন আজ দৃশ্যমান হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, শিল্পায়ন, আধুনিকায়ন ও টেকসই উন্নয়নের জন্য নিরবচ্ছিন্ন, নির্ভরযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব জ্বালানি অত্যাবশ্যক। এই প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক শক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। এটি কেবল বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয়, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্ভাবনাকেও শক্তিশালী করবে।
উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, রূপপুর প্রকল্পে জ্বালানি লোডিং একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি, যা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও দেশীয় সক্ষমতার প্রতিফলন। এটি বাংলাদেশের জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে।
রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ বলেন, বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যেমন সহযোগিতা করা হয়েছে, ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। তিনি নিরাপত্তা বিষয়ে জনগণকে আশ্বস্ত করে বলেন, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়েছে এবং নিরাপদভাবেই বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনাসহ ভবিষ্যতের প্রয়োজনেও সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন করতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রথম ইউনিট থেকে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হবে।
উল্লেখ্য, গত ১৬ এপ্রিল বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (বায়েরা) প্রথম ইউনিটের জন্য কমিশনিং লাইসেন্স প্রদান করে, যার মাধ্যমে জ্বালানি লোডিংয়ের পথ সুগম হয়।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জায়েদুল হাসান জানান, কেন্দ্র পরিচালনার জন্য ৫২ জন বিশেষজ্ঞ লাইসেন্স অর্জন করেছেন। তাদের সঙ্গে রাশিয়ার লাইসেন্সধারী অপারেটরদের সমন্বয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি পরিচালিত হবে।
প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, প্রতি মাসে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। পূর্ণ সক্ষমতায় প্রথম ইউনিট থেকে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে পৌঁছাতে ৮ থেকে ১০ মাস সময় লাগতে পারে। এছাড়া চলতি বছরের শেষ দিকে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
পদ্মা নদীর তীরে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত এই প্রকল্পে রাশিয়ার আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা নেওয়া হয়েছে। এখানে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। উভয় ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করবে।
১১৬ বার পড়া হয়েছে