সর্বশেষ

সারাদেশ

অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিনের আগেই থেমে গেল বাবার স্বপ্ন

বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ
বাদল সাহা, গোপালগঞ্জ

সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:১৬ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ সোমবার, ২৭ এপ্রিল। একমাত্র সন্তান অব্যয় বৈরাগীর প্রথম জন্মদিন ঘিরে ছিল নানা পরিকল্পনা। কিন্তু সেই আনন্দ আর উদযাপন আর পূরণ হলো না কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর পরিবারে।

জন্মদিনের আগেই গত ২৪ এপ্রিল তিনি নিখোঁজ হন এবং ২৫ এপ্রিল তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছেলের প্রথম জন্মদিনে বাবার এমন পরিণতি পরিবারকে নিমজ্জিত করেছে গভীর শোকে। জন্মদিনের আনন্দ এক রাশ বিষাদে রূপ নেয়।

পরিবার সূত্রে জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন আগেই বুলেট বৈরাগীর বিবাহ বার্ষিকী ছিল। রবিবার (২৬ এপ্রিল) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে তাঁর লাশবাহী অ্যাম্বুলেন্স গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া ইউনিয়নের উত্তরপাড়া গ্রামের নিজ বাড়ির উঠানে পৌঁছালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। স্বামীর লাশবাহী গাড়ির সামনে কান্নায় ভেঙে পড়েন স্ত্রী উর্মি হীরা।

বুলেট বৈরাগীর বাবা সুশীল বৈরাগী ছেলেকে মানুষ করতে নিজের শেষ সম্বল ২৭ শতক ধানের জমি বিক্রি করেছিলেন। অসুস্থ শরীর নিয়েও অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালিয়েছেন এবং ছেলের পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন। মা লিলিমা বৈরাগীও নিজের কানের স্বর্ণের দুল বিক্রি করে ছেলের ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করেন।

মায়ের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে বুলেট প্রায়ই বলতেন, তিনি যেন বন্ধুদের কাছে না বলেন যে তাঁর বাবা অন্যের জমিতে কাজ করেন। তবে বুলেট গর্ব করে বলতেন, তাঁর বাবা কষ্ট করে তাঁকে পড়াচ্ছেন—এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় গর্ব।

অভাবের সংসারে বড় হলেও বুলেটের স্বপ্ন ছিল অনেক বড়। ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতে বলতেন, তিনি নিজেই সেলাই করে জামা পরেন।

বুলেট বৈরাগী টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া বহুমুখী উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, গোপালগঞ্জের হাজী লালমিয়া সিটি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং পরে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। কর্মজীবন শুরু করেন খাদ্য অধিদপ্তরে। পরে ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার হিসেবে ঢাকা কাস্টমস কার্যালয়ে যোগ দেন এবং সর্বশেষ কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে কর্মরত ছিলেন।

২৪ এপ্রিল পরিবারের সঙ্গে শেষবার কথা বলার পর হঠাৎই তাঁর ফোন বন্ধ হয়ে যায়। পরদিন সকালে কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকায় সড়কের পাশ থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় পুরো গ্রামজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বুলেটকে শেষবার দেখতে ভিড় করছেন গ্রামবাসী ও সহপাঠীরা। আসামিদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন তারা।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে আমগাছের ছায়ায় নীরবে বসে আছেন স্বজনরা। কেউ কথা বলার অবস্থায় নেই। বৃদ্ধ দাদি নাতির মৃত্যুর সংবাদে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। পাশেই কাঠের একটি কফিন তৈরি করা হচ্ছে, যেখানে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন বুলেট।

চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পুরো গ্রামই এখন স্তব্ধ। কেউই বিশ্বাস করতে পারছেন না এমন পরিশ্রমী ও ভদ্র একজন মানুষের এমন পরিণতি হতে পারে।

স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, তিনি শুধু স্বামীর রক্তাক্ত শরীর দেখেছেন। ময়নাতদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদনের বাইরে তাঁর একটাই প্রশ্ন—আসলে কী ঘটেছিল তাঁর স্বামীর সঙ্গে।

মা লিলিমা বৈরাগী ছেলের হত্যার বিচার দাবি করে বলেন, তাঁর ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি দ্রুত খুনিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চান।

ষাটোর্ধ্ব কাকা বিমল বৈরাগী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, জীবনে কোনো দিন কারও ক্ষতি করেননি বুলেট। সেই শান্ত ছেলেটির লাশ আজ রাস্তায় পড়ে থাকতে হয়েছে—সব শেষ হয়ে গেছে।

কাকা সুশান্ত বৈরাগী জানান, ছেঁড়া জামা নিজেই সেলাই করে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন বুলেট। বাড়ি ফিরে হাসতে হাসতে সেটাই বলতেন।

কাকাতো বোন দুলালী রানী মণ্ডল বলেন, তাঁর ছেলের এক বছর পূর্ণ হওয়ার কথা ছিল সোমবার। বড় চাকরিই কি তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ালো—এমন প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে পরিবারে।

বন্ধু তমা বলেন, যারা তাঁর বন্ধুকে এভাবে হত্যা করেছে, তাদের দ্রুত খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।

একটি সম্ভাবনাময় জীবনের এমন করুণ সমাপ্তি শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো গ্রামকেই স্তব্ধ করে দিয়েছে। এখন সবার একটাই দাবি—বুলেট বৈরাগীর হত্যার রহস্য উদঘাটন হোক এবং দোষীরা দ্রুত আইনের আওতায় আসুক।

১২২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন