সর্বশেষ

সাহিত্য

কালান্তরের তর্জনী ও মহাকালের খেয়া: বাংলা সাহিত্যে বৈশাখী চেতনার আধ্যাত্মিক ও লৌকিক বয়ান

গাউসুর রহমান 
গাউসুর রহমান 

শনিবার, ১৮ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:১১ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
মহাকালের চাকা ঘোরে আপন ছন্দে। সময় সেখানে কোনো যান্ত্রিক ঘড়ি নয়, বরং এক আদি-অন্তহীন নদীর মতো, যার বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকে মানুষের হর্ষ-বিষাদ আর রূপান্তরের গল্প।

চৈত্র-শেষের সেই গোধূলি বেলায় যখন ঝরা পাতার মর্মর ধ্বনি শোনা যায়, তখন বাঙালির মনে হয়, পুরনো সব চেনা চাদর যেন খসে পড়ছে। এই যে নতুনের আবাহন, এই যে জরাগ্রস্ত অতীতকে বিসর্জন দিয়ে অজানার পথে পা বাড়ানো—তা কেবল পঞ্জিকার একটি পাতার বদল নয়। এটি একটি দর্শনের নাম। বাংলা সাহিত্যে নববর্ষ বা বৈশাখ তাই কেবল কোনো ঋতু-উপাখ্যান হয়ে থাকেনি; তা হয়ে উঠেছে বাঙালির আত্মপরিচয় খোঁজার এক সুগভীর মাধ্যম। 

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে বৈশাখ এক ‘তাপস’। তাঁর দর্শনে বৈশাখ মানেই আগুনের পরশমণি দিয়ে নিজেকে ধুয়ে নেওয়া। কবি দেখেছিলেন, বছরের শেষে যে গ্লানি, যে ধুলোবালি জমে ওঠে মনের কোণে, তাকে দূর করতে সাধারণ কোনো বারিবর্ষণ যথেষ্ট নয়। তার জন্য প্রয়োজন রুদ্রের তপস্যা। রবীন্দ্রনাথের সেই কালজয়ী আহ্বান:

“এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ
তাপস নিঃশ্বাস বায়ে
মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে
বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক॥
যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি,
অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক॥”

এখানে বৈশাখ কোনো কোমল বসন্ত নয়। সে এক সন্ন্যাসী, যার উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে মরণোন্মুখ প্রাণগুলো আবার নতুন করে জেগে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ চাইছেন ‘অগ্নিস্নান’। মানুষের ক্ষুদ্র অহংকার, পুরনো শোক আর ব্যর্থতার স্মৃতিগুলো যখন জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসে, তখন বৈশাখের প্রলয়-শাঁখ বেজে ওঠে। ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জরা’—এই পঙক্তিগুলোর গভীরে ডুব দিলে বোঝা যায়, কবি আসলে এক আধ্যাত্মিক শুদ্ধিকরণের কথা বলছেন। প্রকৃতির ধূসর মরুময়তার আড়ালে লুকিয়ে থাকে প্রাণের রস। সেই রসকে জাগিয়ে তুলতেই তিনি বৈশাখকে আহ্বান জানাচ্ছেন সব ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’ ছিন্ন করে আসার জন্য।

আবার রবীন্দ্রনাথের অন্য এক কবিতায় বৈশাখের এই রূপটি আরও গম্ভীর, আরও অনিশ্চিত। সেখানে তিনি বলছেন:

“নববর্ষ এল আজি দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে;
আনে নি আশার বাণী, দেবে না সে করুণ প্রশ্রয়;
প্রতিকূল ভাগ্য আসে হিংস্র বিভীষিকার আকারে—
তখনি সে অকল্যাণ যখনি তাহারে করি ভয়।”

কী আশ্চর্য এক জীবনবোধ! কবি বলছেন, নতুন বছর সবসময় যে হাসি-গান নিয়ে আসবে এমন নয়। কখনো কখনো তা দুর্যোগের কালো মেঘেও ঢাকা থাকতে পারে। কিন্তু সেই অন্ধকারকে ভয় পেলেই অকল্যাণ। বৈশাখের রুদ্র রূপকে যদি সাহসের সাথে বরণ করে নেওয়া যায়, তবেই সেই প্রলয়ের ভেতর থেকে নবজীবনের আলো ফুটে বেরোয়। এই রুদ্রতা আসলে সৃজনেরই প্রথম ধাপ।

রবীন্দ্রনাথের এই শান্ত অথচ গভীর আধ্যাত্মিকতার বিপরীতে কাজী নজরুল ইসলামের বৈশাখ এক উন্মত্ত যৌবনের প্রতীক। নজরুলের চোখে বৈশাখ মানেই বিদ্রোহ, শেকল ভাঙার গান। তাঁর ‘প্রলয়োল্লাস’ কবিতায় বৈশাখী ঝড় কেবল একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং তা শোষিত মানুষের হুংকার। পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্তির জন্য যে ধ্বংস অনিবার্য, নজরুল সেই ধ্বংসের মাঝেই খুঁজে পান নতুনের কেতন:

“তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!
ঐ নূতনের কেতন ওড়ে কালবোশেখির ঝড়।
তোরা সব জয়ধ্বনি কর! তোরা সব জয়ধ্বনি কর!!”

নজরুলের কাছে নববর্ষ মানে জরাজীর্ণ পৃথিবীকে উল্টে দেওয়া। তিনি জানেন, প্রলয় ছাড়া সৃজন সম্ভব নয়। তাই তিনি নির্ভয়ে ডাক দেন ‘অনাগত প্রলয়-নেশায় নৃত্য-পাগল’ বৈশাখকে। যে বৈশাখ ‘সিন্ধু-পারের সিংহ-দ্বারে’ আঘাত হেনে আগল ভেঙে দেয়। নজরুলের দর্শনে বৈশাখ কোনো বৈরাগ্য নয়, বরং তা এক প্রচণ্ড কর্মতৎপরতা। ‘আসছে নবীন-জীবন-হারা অ-সুন্দরে করতে ছেদন’—এই বোধই বাঙালির প্রাণের শক্তি। জীর্ণ সমাজব্যবস্থা আর কুসংস্কারের যে জঞ্জাল আমাদের আচ্ছন্ন করে রেখেছে, নজরুলের বৈশাখী ঝড় তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায়। ধ্বংস দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই, কারণ এই ধ্বংসই হলো ‘নতুন সৃজন-বেদন’। প্রসববেদনা যেমন নতুন প্রাণের ইঙ্গিত দেয়, নজরুলের কালবৈশাখীও তেমনি এক সুন্দর আগামীকে গর্ভে ধারণ করে।

নজরুলের এই প্রলয়নাচনের পাশে ফররুখ আহমদের বৈশাখ যেন এক দুর্ধর্ষ মরু-সেনানী। তাঁর কবিতায় বৈশাখ আসে অদম্য পৌরুষ আর দুর্দমনীয় গতি নিয়ে। ফররুখ বৈশাখকে দেখছেন এক মহাশক্তির প্রতীক হিসেবে, যা ইতিহাসের স্থবিরতাকে ভেঙে চুরমার করে দেয়:

“ধ্বংসের নকীব তুমি হে দুর্বার, দুর্ধর্ষ বৈশাখ
সময়ের বালুচরে তোমার কঠোর কণ্ঠে
শুনি আজ অকুণ্ঠিত প্রলয়ের ডাক॥
সংগ্রামী তোমার সত্তা অদম্য, অনমনীয়—
বজ্র দৃঢ় প্রত্যয় তোমার…”

তাঁর ‘বৈশাখের কালো ঘোড়া’ কবিতায় এই গতির রূপকটি আরও স্পষ্ট। বৈশাখ এখানে এক কাল্পনিক এবং পরাক্রমশালী ঘোড়া, যার খুরের আঘাতে প্রান্তর থরথর করে কাঁপে:

“বৈশাখের কালো ঘোড়া উঠে এলো।
বন্দর, শহর পার হয়ে সেই ঘোড়া যাবে দূর কোকাফ মুলুকে,
অথবা চলার তালে ছুটে যাবে কেবলি সম্মুখে
প্রচণ্ড আঘাতে পায়ে পিষে যাবে অরণ্য, প্রান্তর।”

ফররুখ আহমদের এই বৈশাখ যেন কোনো ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ থাকতে চায় না। সে ছুটে চলে ‘কোকাফ মুলুক’ থেকে অনন্তের দিকে। এই কালো ঘোড়া আসলে মানুষের অবদমিত ইচ্ছাশক্তি আর পরিবর্তনের দুর্বার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। এটি সেই শক্তি যা কোনো বাধাকেই মান্য করে না, বরং অরণ্য আর প্রান্তরকে পিষে ফেলে নিজের পথ করে নেয়। এই সাহিত্যে বৈশাখ মানেই স্থিতাবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রচণ্ড বিদ্রোহ।

এত ঝড়-ঝাপটা আর প্রলয়-হুংকারের মাঝে জীবনানন্দ দাশের বৈশাখ যেন এক স্নিগ্ধ প্রভাতের স্মিত হাসি। জীবনানন্দ প্রকৃতির কবি, তিনি বৈশাখের রুদ্র রূপের চেয়ে তার ধুয়ে-মুছে যাওয়া পরিচ্ছন্ন রূপটিকে বেশি ভালোবাসতেন। তাঁর কাছে নববর্ষের প্রথম সকাল মানে ‘দীপ্ত নীল’ আকাশে ‘শুভ্র রাগে’ উদিত সূর্য। তিনি দেখেন:

“ওই যে পূর্ব তোরণ-আগে দীপ্ত নীলে, শুভ্র রাগে
প্রভাত রবি উঠলো জেগে দিব্য পরশ পেয়ে,
নাই গগণে মেঘের ছায়া যেন স্বচ্ছ স্বর্গকায়া
ভুবন ভরা মুক্ত মায়া…”

জীবনানন্দের বৈশাখে কোনো কোলাহল নেই, নেই কোনো রক্তচক্ষু। সেখানে আছে এক আধ্যাত্মিক প্রশান্তি। আকাশের মেঘ সরে গিয়ে যখন এক ‘স্বচ্ছ স্বর্গকায়া’ মায়ার মতো বিছিয়ে থাকে চারদিকে, তখন মনে হয় পৃথিবীটা যেন পুনর্জন্ম লাভ করেছে। তাঁর দর্শনে বৈশাখ মানে মুক্তির স্বাদ—সেই মুক্তি যা মানুষকে প্রকৃতির নিগূঢ় সৌন্দর্যের সাথে একাত্ম করে দেয়। রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ যেখানে তপ্ত নিঃশ্বাস ফেলে, জীবনানন্দের বৈশাখ সেখানে শিশিরভেজা ঘাস আর রোদের আল্পনায় মনের দুয়ার খুলে দেয়। তাঁর কবিতায় বৈশাখ এক চিরন্তন বাংলার মুখাবয়ব হয়ে ধরা দেয়, যেখানে সময়ের ক্ষতগুলো নিরাময় হয় সূর্যের কোমল স্পর্শে।

বাংলার বৈশাখ পূর্ণতা পায় না যদি না সেখানে মেঠো পথের ধুলো আর কৃষকের ঘামের ঘ্রাণ থাকে। পল্লীকবি জসীমউদ্দীন বৈশাখকে দেখেছিলেন বাংলার সেই চিরকালীন রূপের মধ্যে। তাঁর কাছে বৈশাখ মানে কালবৈশাখীর আতঙ্ক যেমন সত্য, তেমনি সত্য বৈশাখ শেষে মাঠের সেই উপচে পড়া সোনাঝরা ফসলের দৃশ্য। ‘বোশেখ শেষের মাঠ’ কবিতায় তিনি এক অনন্য নিসর্গ চিত্র আঁকেন:

“বোশেখ শেষে বালুচরের বোরো ধানের থান,
সোনায় সোনা মেলিয়ে দিয়ে নিয়েছে কেড়ে প্রাণ।”

জসীমউদ্দীনের বৈশাখ আসলে সাধারণ মানুষের শ্রম আর স্বপ্নের ফসল। বৈশাখ মানে এখানে কেবল উৎসব নয়, বরং চৈত্র সংক্রান্তির গাজন আর বৈশাখের মেলার রঙিন আনন্দ। তাঁর লেখনীতে বৈশাখ এক রক্তমাংসের মানুষ হয়ে ওঠে—যে কখনো রুদ্র ঝড়ে ঘর উড়ায়, আবার কখনো বোরো ধানের সোনালি হাসিতে কৃষকের ঘর ভরিয়ে দেয়। আধুনিক নাগরিক কবিরা যখন বৈশাখকে বিমূর্ত দর্শনে ব্যাখ্যা করেন, জসীমউদ্দীন তখন তাকে মাটির সোঁদা গন্ধে আর হলদে পাখির গানে জীবন্ত করে তোলেন। এই গ্রাম্য বৈশাখই তো বাঙালির শিকড়, যেখানে প্রকৃতির সাথে মানুষের নাড়ির টান অবিচ্ছেদ্য।

সব কবি যখন গুরুগম্ভীর ভাবনায় মগ্ন, সুকুমার রায় তখন বৈশাখ আর নববর্ষকে দেখলেন এক অদ্ভুত কৌতুক ও শিশুতোষ নির্মলতার চশমায়। তাঁর কাছে সময়ের পরিবর্তন মানে এক মজার খেলা। ‘বর্ষ গেল বর্ষ এল’ কবিতায় তিনি খুব সহজ ছন্দে এক গভীর সত্যকে উপস্থাপন করেছেন:

“বর্ষ গেল বর্ষ এল, বৃদ্ব বছর উধাও হ’ল ভূতের মুলুক খুঁজি।
নূতন বছর এগিয়ে এসে হাত পাতে ঐ দ্বারে,
বল্ দেখি মন মনের মতন কি দিবি তুই তারে?”

সুকুমার রায়ের বৈশাখ আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জীবনটা কেবল কান্নাকাটি বা সংগ্রামের ক্ষেত্র নয়, এখানে হাসির খোরাকও আছে প্রচুর। পুরনো বছরটাকে ‘ভূতের মুলুকে’ পাঠিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি এক ধরনের মুক্তির বার্তা দেন। নতুনের দ্বারে আমরা কী উপহার দেব—এই প্রশ্নটি আসলে প্রতিটি মানুষের বিবেকের কাছে। বৈশাখ মানে কি কেবল ভালো খাওয়া আর পোশাক পরা? নাকি মনের মধ্য থেকে মলিনতা দূর করে একটুখানি হাসি আর সারল্য নতুনের হাতে তুলে দেওয়া? তাঁর ‘বর্ষ শেষ’ কবিতায়ও এই পালাবদলের চিত্রটি ফুটে ওঠে এক অদ্ভুত খেয়ালি ঢঙে। সুকুমারের বৈশাখ যেন এক চঞ্চল শিশু, যে নতুন খেলনা নিয়ে আমাদের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে।

বিভিন্ন কবিদের রয়েছে নববর্ষ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি—এরা আসলে একে অপরের পরিপূরক। বৈশাখ তো একপাক্ষিক কিছু নয়। তা যেমন রুদ্র, তেমনি শান্ত; যেমন প্রলয়ংকরী, তেমনি সৃজনশীল। বাংলা সাহিত্যে নববর্ষের এই বিবর্তন পর্যালোনা করলে দেখা যায়, বাঙালি জাতি আসলে তার জীবনের সমস্ত দ্বন্দ্ব আর সমন্বয়কে এই মাসটির মধ্যে খুঁজে পেয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ যে ‘তাপস নিঃশ্বাসের’ কথা বলেছেন, তা আসলে আমাদের অন্তরের জড়তা কাটানোর শক্তি। নজরুল যে ‘প্রলয়োল্লাসের’ কথা বলেছেন, তা অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস। জীবনানন্দের ‘দীপ্ত নীল’ আকাশ আমাদের শেখায় সব ঝড়ের শেষে এক নির্মল শান্তি অপেক্ষা করে। ফররুখ আহমদের ‘কালো ঘোড়া’ আমাদের গতির মন্ত্র দেয়, আর জসীমউদ্দীনের ‘বোরো ধানের মাঠ’ আমাদের মাটির কাছাকাছি থাকতে শেখায়। সব শেষে সুকুমার রায়ের কৌতুক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়ে ভারাক্রান্ত না করে সহজভাবে গ্রহণ করাই প্রকৃত প্রজ্ঞা।

বাংলা সাহিত্যে বৈশাখ তাই এক বহুমাত্রিক দর্শন। এটি কখনো কৃষকের হালখাতার নতুন পাতা, কখনো বিপ্লবীর তপ্ত বুলেট। চৈত্র মাসের শেষে যখন গাছ থেকে শেষ শুকনো পাতাটি ঝরে পড়ে, তখন তা কেবল একটি মৃত্যু নয়, বরং এক নবজাতকের আগমনের ঘোষণা। প্রকৃতি যেমন জরাগ্রস্ত অংশকে ঝেড়ে ফেলে নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে নেয়, সাহিত্যিকরাও আমাদের মনকে তেমনিভাবে নবায়নের পরামর্শ দিয়েছেন।

আজকের এই যুগে, যেখানে মানুষের সাথে মানুষের দূরত্ব বাড়ছে, সেখানে নববর্ষের এই সাহিত্যিক ঐতিহ্য আমাদের আবার এক হতে শেখায়। সাহিত্যে নববর্ষের মূল সুরটি হলো ‘অসাম্প্রদায়িকতা’। এখানে কোনো ধর্মের ভেদাভেদ নেই, নেই কোনো উঁচুনীচু বিভেদ। বৈশাখ সবার জন্য সমানভাবে রোদ ছড়িয়ে দেয়, সমানভাবে ঝড় পাঠায়। আমাদের কবিরা যুগে যুগে এই সত্যটিকেই প্রতিষ্ঠিত করেছেন যে, বাঙালি সত্তার প্রকৃত জাগরণ ঘটে বৈশাখের এই উদার প্রান্তরে।

সময়ের এই যে প্রবহমানতা, একে ধারণ করাই সাহিত্যের কাজ। কবিরা যা লিখে গিয়েছেন, তা কেবল শব্দ নয়, বরং অভিজ্ঞতার নির্যাস। চৈত্র-সংক্রান্তির সেই গোধূলি বেলায় আমরা যখন আকাশের দিকে তাকাই, তখন মনে হয়—সত্যিই তো, ‘পুরাতন স্মৃতি’ আর ‘ভুলে-যাওয়া গীতি’ গুলোকে দূরে সরিয়ে না দিলে নতুন সুর ধরব কেমন করে? মহাকাল তো কারো জন্য অপেক্ষা করে না। সে বয়ে যায়। কিন্তু সেই বয়ে যাওয়ার মাঝেও কিছু অক্ষয় চিহ্ন আমাদের সাহিত্যে থেকে যায়।

বৈশাখ আসলে একটি আয়না। এই আয়নায় আমরা আমাদের নিজেদেরই বিবর্তিত রূপ দেখতে পাই। রবীন্দ্রনাথ থেকে জসীমউদ্দীন—প্রত্যেকেই আমাদের শিখিয়েছেন যে, পরিবর্তনই জীবনের একমাত্র সত্য। ধ্বংস ছাড়া যেমন নতুন জন্ম হয় না, তেমনি অশ্রু ছাড়া হাসির প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় না। নববর্ষ আমাদের সেই দ্বান্দ্বিক দর্শনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়।

বৈশাখের রোদ যেমন প্রখর, তেমনি কালবৈশাখীর বর্ষণ যেমন শীতল—এই রোদ আর বৃষ্টির খেলাই তো আমাদের জীবন। কালান্তরের এই পদাবলিতে বৈশাখ তাই কেবল একটি মাস নয়, বরং বাঙালির অনন্তকাল বেঁচে থাকার এক শাশ্বত ইশতেহার। যতদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতদিন এদেশের মাঠে সোনালি ধান দুলবে, যতদিন আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা দেখে মানুষের মন নেচে উঠবে, ততদিন আমাদের সাহিত্যে বৈশাখ থাকবে এক চিরতরুণ মহাবীর হিসেবে।

বৈশাখ আমাদের শেখায়, জীর্ণতাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পুরনো ডাল ভেঙে গেলেই সেখানে নতুন কুঁড়ি আসার সুযোগ পায়। কবিদের কলমে সেই কুঁড়ি ফোটার গানই আমরা শুনি। বৈশাখ মানেই তো ফিরে আসা—শিকড়ে ফিরে আসা, মানুষের কাছে ফিরে আসা, আর সবশেষে নিজের অন্তরের সেই নির্মল সত্তার কাছে ফিরে আসা যাকে ‘অগ্নিস্নানে’ শুচি করে নিয়েছেন বিশ্বকবি। এই বিবর্তন, এই নান্দনিকতা আর এই দর্শনই বাঙালির শ্রেষ্ঠ সম্পদ। কালান্তরের এই দীর্ঘ যাত্রাপথে বৈশাখ আমাদের হাতে হাত রেখে বলে যায়—‘ভয় নেই, নতুনের জয়ধ্বনি কর।’ আর এভাবেই বাঙালি তার সহস্র বছরের ঐতিহ্য নিয়ে নব নব রুপে জেগে ওঠে প্রতিদিনের ভোরে, প্রতি বছরের বৈশাখে।


লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সাহিত্য নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন