২ দিনেও উদ্ধার হয়নি শরীফ বাহিনীর হাতে অপহৃত ১০ জেলে
বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:২৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সুন্দরবনের দস্যুমুক্ত ভাবমূর্তিকে চ্যালেঞ্জ করে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দুর্ধর্ষ বনদস্যুদের প্রায় ৮ থেকে ১০টি বাহিনী। গত বুধবার (১৫ এপ্রিল) গভীর রাতে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জ থেকে অপহৃত ১০ জেলের এখনো পর্যন্ত কোনো খোঁজ মেলেনি।
ঘটনার দুই দিন অতিবাহিত হলেও বনের গহীন অঞ্চলে জিম্মি থাকা এসব জেলেকে উদ্ধারে কোস্ট গার্ড ও বন বিভাগের অভিযান চললেও এখন পর্যন্ত কোনো সফলতা আসেনি।
এদিকে বনদস্যু ‘করিম শরীফ বাহিনী’ অপহৃতদের পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে অপহৃত জেলেদের উদ্ধারে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বন বিভাগ ও কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা।
বন বিভাগ ও স্থানীয় জেলেদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বুধবার রাতে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের জিউধারা স্টেশনের আওতাধীন বরইতলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন শুয়ারমারা খালে একদল জেলে নৌকায় করে মাছ ধরছিলেন। এ সময় প্রায় ১৫ থেকে ২০ জন জেলের একটি বহরে অতর্কিত হামলা চালায় সশস্ত্র বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী। দস্যুরা অস্ত্রের মুখে জেলেদের জিম্মি করে এবং মারধর করে তাদের কাছে থাকা মালামাল লুট করে নেয়। একপর্যায়ে ১০ জন জেলেকে অপহরণ করে বনের গভীর অন্ধকারে ট্রলারযোগে পালিয়ে যায় তারা।
অপহৃত ১০ জেলের মধ্যে ৫ জনের বাড়ি মোংলার সুন্দরবন ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে। তারা হলেন—নাসির শেখের ছেলে মানিক শেখ, আরভ গাজীর ছেলে আবু বকর গাজী, আমজাদ ফরাজীর ছেলে জাকির ফরাজী, হানিফ সিকদারের ছেলে নুরজামাল শিকদার এবং ওহিদ মুন্সির ছেলে ওয়াহিদ মুন্সি। বাকি ৫ জন জেলের বাড়ি পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তাদের নাম-পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। প্রিয়জনদের নিখোঁজ সংবাদে ওই পরিবারগুলোতে এখন চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
অপহৃতদের পরিবারের সদস্যরা জানান, দস্যুরা মোবাইল ফোনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে জনপ্রতি ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করেছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা না দিলে জেলেদের মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। বনের এমন অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে সাধারণ জেলেদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেক জেলে প্রাণের ভয়ে বন ছেড়ে লোকালয়ে ফিরে আসতে শুরু করেছেন, যার ফলে উপকূলীয় মৎস্য আহরণ খাতে বড় ধরনের স্থবিরতার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোন (মোংলা)-এর গোয়েন্দা বিভাগ জানিয়েছে, অপহরণের খবর পাওয়ার পরপরই তারা বনের বিভিন্ন সম্ভাব্য স্থানে উদ্ধার অভিযান শুরু করেছে। পশুর নদীসহ সুন্দরবনের গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোতে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। তবে সুন্দরবনের প্রতিকূল ভৌগোলিক পরিস্থিতি এবং দস্যুদের ঘন ঘন স্থান পরিবর্তনের কারণে উদ্ধার কার্যক্রম কিছুটা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বন বিভাগের জিউধারা, চাঁদপাই ও ঢাংমারী স্টেশনের কর্মকর্তারাও কোস্ট গার্ডের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করছেন।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, এক সময় র্যাব ও কোস্ট গার্ডের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সুন্দরবন প্রায় দস্যুমুক্ত হয়েছিল। কিন্তু গত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর প্রশাসনিক টহল ও তৎপরতা কিছুটা শিথিল হওয়ায় সুন্দরবনে আবারও নতুন নতুন দস্যু বাহিনী গড়ে উঠছে। সুন্দরবনকে স্থায়ীভাবে নিরাপদ রাখতে এবং সাধারণ জেলেদের জীবিকা নির্বাহ নিশ্চিত করতে পুনরায় ‘স্পেশাল ড্রাইভ’ বা চিরুনি অভিযান পরিচালনা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের এই অপহরণ কেবল একটি অপরাধ নয়, এটি উপকূলীয় অর্থনীতির ওপর একটি বড় আঘাত। যদি দ্রুততম সময়ে এই ১০ জেলেকে উদ্ধার করা না যায় এবং দস্যু দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়, তবে বনজীবী সাধারণ মানুষের মধ্যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে আস্থার সংকট তৈরি হবে।
২৪৯ বার পড়া হয়েছে