বাগেরহাটে এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট
বুধবার, ২৫ মার্চ, ২০২৬ ৩:৪৯ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাগেরহাটে এক সপ্তাহ ধরে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ফিলিং স্টেশনগুলোতে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না যানবাহন চালকরা।
ঈদের তিন দিন আগে মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকে বাগেরহাটের পেট্রোল পাম্পগুলোর এই অবস্থা দেখা দিয়েছে।
ঈদের পরে সরকারি অফিস খোলার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম। মঙ্গলবার সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত বেশিরভাগ পাম্পে তেল পাওয়া যায়নি। সকালে শহরের খারদ্বার এলাকায় খানজাহান আলী ফিলিং স্টেশন ও বরকত ফিলিং স্টেশন ঘুরে পেট্রোল না পেয়ে ইউনুস শেখ নামের এক মোটরসাইকেল চালক শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দূরে সাইনবোর্ড বাজারের ওসমান আলী ফিলিং স্টেশনে ছুটে যান। সেখানে ঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার তেল নিয়ে ফিরতে হয়েছে তাকে।
এভাবেই জ্বালানি তেলের হাহাকার শুরু হয়েছে বাগেরহাটে। জেলার বাগেরহাট সদর, কচুয়া, ফকিরহাট, মোল্লাহাট ও শরণখোলা উপজেলায় মোট ২৩টি ফিলিং স্টেশন রয়েছে। অন্য চারটি উপজেলার মানুষকেও নির্ভর করতে হয় এসব ফিলিং স্টেশনের উপর। ২৩টি ফিলিং স্টেশনেই তীব্র তেল সংকট দেখা দিয়েছে। পাম্প মালিকদের দাবি, প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম তেল দেওয়া হচ্ছে।
ঔষধ কোম্পানিতে চাকরি করা রোকনুজ্জামান বলেন, “পেশাগত কারণে প্রতিদিন একশ কিলোমিটারের বেশি গাড়ি চালাতে হয়। এক সপ্তাহ ধরে তেলের খুব সংকট চলছে। খুবই চিন্তায় আছি, কখন যেন পুরোপুরি গাড়ি বন্ধ হয়ে যায়।”
সিগারেট কোম্পানিতে চাকরি করা নুরুজ্জামান বলেন, “গতকাল রাতে ৩ ঘন্টা দাঁড়িয়ে ২০০ টাকার তেল নিয়েছি। সকাল থেকে আবারও মার্কেটে আছি। সুযোগ পেলেই পাম্পে ঢুঁ মারি, যদি তেল আসে, নিয়ে নেব। চাকরি বাঁচাতে মোটরসাইকেল প্রয়োজন।”
এভাবেই অসহায়ত্বের কথা প্রকাশ করছেন মোটরসাইকেল চালকরা।
অন্যদিকে, গণপরিবহনের চাহিদার তুলনায় কম তেল দিয়ে ডিজেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন পাম্প মালিকরা। কারণ, ডিজেল সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে গণপরিবহন বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া ধান ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গণপরিবহন চালকদের দাবি, পর্যাপ্ত তেল না দেওয়ায় অতিরিক্ত চাপের মধ্যে গাড়ি চালাতে হচ্ছে তাদের।
রায়েন্দা-ঢাকা রুটের বাস চালক আনসার মুসল্লী বলেন, “ডিজেলের সংকটের কারণে নির্ধারিত সময় অনুযায়ী বাস চালানো সম্ভব হচ্ছে না। মাঝপথে একাধিক পাম্পে তেল নিতে সিরিয়ালে দাঁড়াতে হচ্ছে। যার কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছি না। এতে অনেক সময় যাত্রীরা ক্ষুব্ধ হয়ে আমাদের ওপর চড়াও হচ্ছেন।”
পেট্রোল মালিকদের দাবি, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় ১০ থেকে ২০ শতাংশ তেল দেওয়া হচ্ছে। যার কারণে পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করা যাচ্ছে না। বেশিরভাগ সময় পুরোপুরি পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
খানজাহান আলী ফিলিং স্টেশনের নজেল ম্যান আছাদ বলেন, “উপর থেকে যদি আমাদের তেল না দেওয়া হয়, আমরা কোন জায়গা থেকে গাড়িতে তেল দিব? প্রতিদিন ৩ হাজার লিটার পেট্রোল ও ২৫শ লিটার অকটেন দরকার, সেখানে দুই দিন পরে ১৫শ লিটার অকটেন দেওয়া হচ্ছে। অকটেন দিলে পেট্রোল দেওয়া হয় না। এভাবে চলা খুব কষ্টের। অনেকেই আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেন। কিন্তু আমাদের কি করার আছে?”
কচুয়া উপজেলার সাইনবোর্ড বাজারের ওসমান আলী ফিলিং স্টেশনের স্বত্বাধিকারী বদিউজ্জামান খোকন বলেন, “ডিপো থেকে তেল পাইলেই আমরা যানবাহনে তেল সরবরাহ করছি। প্রয়োজনের তুলনায় কম তেল পাওয়ায় কিছুটা সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সকালে যতক্ষণ তেল ছিল, আমরা তেল সরবরাহ করেছি।”
বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন বলেন, “তেলের সংকটের জন্য আমরা সাধারণ মানুষকেও অনেকটা দায়ী মনে করি। অনেকেই তেল কিনে অবৈধভাবে মজুদ করছেন বাড়তি লাভে বিক্রির আশায়। এছাড়া প্রয়োজন না থাকলেও কেউ কেউ গাড়ির ট্যাংকি পূর্ণ করে রাখছেন, যার কারণে তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে। আমরা ইতিমধ্যেই মাঠ পর্যায়ে তদারকি শুরু করেছি। যারা অবৈধভাবে তেল মজুদ করছে, তাদের চিহ্নিত করে অভিযান চালানো হবে।”
১৮৫ বার পড়া হয়েছে