জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ, আইএমইডি প্রতিবেদনে উদ্বেগজনক
রবিবার, ১৫ মার্চ, ২০২৬ ৫:১১ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দেশের গ্রামীণ এলাকায় পানি ও স্যানিটেশন সুবিধা উন্নয়নের লক্ষ্যে নেওয়া জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের একটি বড় প্রকল্পে নানা অনিয়ম ও ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ না করা, নকশা ও স্পেসিফিকেশন না মেনে নির্মাণকাজ করা এবং নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের মতো নানা অসঙ্গতি উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি)-এর এক প্রতিবেদনে।
প্রতিবেদনটি মূলত প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা ঠিকভাবে সেবা পাচ্ছেন কি না তা যাচাই করতে তৈরি করা হয়। এতে দেখা গেছে, প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অনেক স্থাপনার মান সন্তোষজনক নয় এবং অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো ব্যবহার অনুপযোগী অবস্থায় রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘মানবসম্পদ উন্নয়নে গ্রামীণ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রকল্পের আওতায় ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও মুক্তাগাছা উপজেলায় নির্মিত কিছু পাবলিক টয়লেটের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। কোথাও দুর্গন্ধ ও ময়লার কারণে ভেতরে প্রবেশ করা দায়, আবার কোথাও টাইলস ভেঙে গেছে কিংবা মেঝে দেবে গেছে। অনেক টয়লেটের দরজা খোলা যায় না এবং ভেতরে মাকড়সার জাল জমে রয়েছে।
এ ছাড়া নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে হতদরিদ্র পরিবারের জন্য টুইন পিট ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রায় ১ হাজার ৮৮৩ কোটি টাকার এই প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে কোনো সম্ভাব্যতা সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) করা হয়নি বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালের ২২ ডিসেম্বর সরকার এই প্রকল্পের অনুমোদন দেয়। প্রকল্পটি ২০২১ সালে শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর দেশের আট বিভাগের ৩০ জেলার ৯৮টি উপজেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
প্রকল্পের আওতায় গ্রামে পাইপলাইনের মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের বড় ও ছোট স্কিম, স্বাস্থ্যসম্মত পাবলিক টয়লেট স্থাপন, কমিউনিটি ক্লিনিকে স্যানিটেশন ও হাইজিন সুবিধা, হাত ধোয়ার স্টেশন এবং হতদরিদ্র পরিবারের জন্য পিট ল্যাট্রিন স্থাপনের পরিকল্পনা ছিল। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও প্রকল্পের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএমইডির সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেছেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা নিয়মকানুন মানা হয়নি এবং ইচ্ছাকৃতভাবেই অনিয়ম করা হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী তবিবুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, “সব বিষয় আমার জানা সম্ভব নয়। যেখানে ত্রুটি পাওয়া গেছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের চিঠি দেওয়া হয়েছে।”
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, এত বড় প্রকল্পে অনিয়ম হলে এর দায় এককভাবে কারও ওপর চাপানো যায় না। তিনি বলেন, “বিশ্বব্যাংক, পরিকল্পনা কমিশন এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থা—সবাই দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সঠিকভাবে তদারকি হলে এত অনিয়ম হওয়ার কথা নয়।”
আইএমইডির প্রতিবেদনে বিভিন্ন জেলার প্রকল্প বাস্তবায়নে নানা অসঙ্গতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। জামালপুরে পানির পাইপলাইন বসানোর জন্য জলাশয় ভরাট করা হলেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়া হয়নি। চট্টগ্রামে স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ল্যাট্রিন নির্মাণ করা হয়নি। মৌলভীবাজার সদর ও রাজনগর উপজেলায় অনেক জায়গায় পাইপলাইন মাটির নির্ধারিত গভীরতার নিচে না বসিয়ে ওপর দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ত্রিশাল ও মুক্তাগাছায়ও পাইপলাইন স্থাপনে নকশা মানা হয়নি। কোথাও মাত্র কয়েক ইঞ্চি নিচে নিম্নমানের পাইপ বসানো হয়েছে, আবার কোথাও মাটির ওপর দিয়ে পাইপলাইন দেওয়া হয়েছে। কিছু পিট ল্যাট্রিনে নিম্নমানের কাঠ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
বরিশালের হিজলা ও আগৈলঝাড়া উপজেলায় পানির ছোট স্কিমে নির্ধারিত মান অনুযায়ী পাইপ ব্যবহার করা হয়নি। কোথাও কোথাও মাটির মাত্র কয়েক ইঞ্চি নিচে পাইপ বসানো হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে সংযোগ পেতে স্থানীয়দের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া অনেক কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে দূরে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করায় সেগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। পটুয়াখালীর কলাপাড়ার বেশিরভাগ পাবলিক টয়লেটে বিদ্যুৎ সংযোগ নেই। বিভিন্ন জেলা ও প্রতিষ্ঠানে নির্মিত হাত ধোয়ার স্টেশনগুলোর অনেকগুলোই পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও গত বছরের এপ্রিল পর্যন্ত আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪৬ শতাংশ। প্রকল্পের প্রধান কার্যালয়ের সাতজন পরামর্শকের পেছনে প্রায় ২৭ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। এ ছাড়া অডিটে ছয়টি বিষয়ে প্রায় ৫৫ কোটি ৫০ লাখ টাকার আপত্তি রয়েছে।
অন্যদিকে প্রকল্পের খরচ না বাড়ালেও কাজের পরিধি কমিয়ে আনা হয়েছে। বড় পানির স্কিম ৭৮টি থেকে কমিয়ে ৫৪টি করা হয়েছে, আবার প্রতিটির ব্যয় ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। একইভাবে ছোট স্কিম ও টুইন পিট ল্যাট্রিনের সংখ্যাও কমানো হয়েছে, কিন্তু প্রতিটির ব্যয় বাড়ানো হয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়নে গাফিলতি, তদারকির অভাব এবং অনিয়মের কারণে প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৯৫ বার পড়া হয়েছে