গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬: স্বাধীন সাংবাদিকতার সুরক্ষায় ঐক্যের আহ্বান
রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ১:৫৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে গণমাধ্যমকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কোনো বিকল্প নেই—এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিক নেতারা। তাঁদের মতে, বর্তমান সময়ে গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অনৈক্য, যার সুযোগ নিয়ে বারবার গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ওপর হামলা হচ্ছে। এসব আক্রমণ মোকাবিলায় পেশাগত সংহতি এখন সময়ের দাবি।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর ফার্মগেটের কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় ‘গণমাধ্যম সম্মিলন ২০২৬’। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পক্ষে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান জানাতে সম্মিলনের আয়োজন করে নিউজপেপার ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (নোয়াব) ও সম্পাদক পরিষদ।
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে সম্মিলনের সূচনা হয়। পরে গণমাধ্যমের ইতিহাস, স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর আক্রমণ এবং সম্মিলনের লক্ষ্য তুলে ধরে একটি তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সম্মিলনের সূচনা বক্তব্যে সম্পাদক পরিষদের সভাপতি ও ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নূরুল কবীর প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগকে ‘মধ্যযুগীয় বর্বরতা’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, দমকল বাহিনীকে বাধা দিয়ে সাংবাদিকদের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করা শুধু একটি গণমাধ্যম নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজের জন্য ভয়ংকর বার্তা। আজ একটি প্রতিষ্ঠানে হামলা হলে আগামী দিনে অন্যটিতে হবে—এটাই বাস্তবতা।
সব গণমাধ্যম সমানভাবে হুমকির মুখে উল্লেখ করে নূরুল কবীর বলেন, ভিন্নমত ও ভিন্ন কণ্ঠস্বর সমাজের জন্য অপরিহার্য। গণমাধ্যম যদি নীরব হয়ে যায়, তবে অপরাধ ও অন্যায় সমাজে আরও বিস্তার লাভ করবে।
প্রবীণ সাংবাদিক শফিক রেহমান সাংবাদিকদের পেশাগত স্বাধীনতা, নৈতিকতা ও আত্মসম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা শুধু চাকরি নয়—এটি একটি নৈতিক দায়িত্ব। ব্যক্তিপূজা ও দলীয় দালালিতে জড়ালে সাংবাদিকতার মর্যাদা নষ্ট হয়। পেশার মান উন্নয়নে সম্পাদনা ও নৈতিকতা তদারকির জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামো গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টার-এর সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, স্বাধীন সাংবাদিকতা সরকার ও রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সম্পদ। কারণ সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে কেউই সত্য কথা বলার সাহস পায় না—সেই দায়িত্ব পালন করে কেবল স্বাধীন গণমাধ্যম। তিনি আরও বলেন, শক্তিশালী গণমাধ্যম ছাড়া জবাবদিহিমূলক সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান সাংবাদিকদের মধ্যে ঐক্য, সংহতি ও পারস্পরিক সহানুভূতির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, মতাদর্শ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার প্রশ্নে সবাইকে এক কাতারে থাকতে হবে। এই ঐক্যই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় বার্তা।
চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদী-এর সম্পাদক এম এ মালেক বলেন, প্রকৃত সাংবাদিকতার পথ রুদ্ধ হলে তথ্যের শূন্যতা তৈরি হয়, যা ভুয়া সংবাদে পূরণ হয় এবং সমাজে অস্থিরতা বাড়ায়। তিনি দায়িত্বশীল ও ভয়হীন সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
সাবেক গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ সাংবাদিক সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, আইন বাস্তবায়ন না করায় সাংবাদিকদের ওপর হামলার দায় সরকার এড়াতে পারে না। গণতন্ত্রে গ্রেপ্তার কোনো সমাধান নয়—যুক্তি ও আলোচনার মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান হওয়া উচিত।
ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের সভাপতি রেজোয়ানুল হক বলেন, বিরোধী দলে থাকলে গণমাধ্যমকে বন্ধু মনে হয়, ক্ষমতায় গেলে শত্রু। বর্তমান পরিস্থিতিতে গণমাধ্যমের প্রধান সংকট ঐক্যের অভাব। তাই সবাইকে বিভাজন ভুলে একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মিলনে জাতীয় প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টার্স ইউনিটি, বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা ও অনলাইন মাধ্যমের সম্পাদক, প্রকাশক, সাংবাদিক এবং কলাম লেখকেরা অংশ নেন। আয়োজকেরা জানান, ভবিষ্যতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এ ধরনের সম্মিলনের আয়োজন করা হবে, যাতে সাংবাদিকদের ঐক্যকে আরও শক্তিশালী করা যায়।
১৩০ বার পড়া হয়েছে