লালনের সুরে রাজধানীতে ‘আন্তরিক কুষ্টিয়া’র নান্দনিক আত্মপ্রকাশ
বৃহস্পতিবার , ৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ৬:০৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
“মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি” লালন সাঁইজীর এই চিরন্তন বাণী ও সুরে রাজধানীর বুকে যেন জেগে উঠল কুষ্টিয়া। বাউল দর্শনের মানবিক আহ্বান, কুষ্টিয়ার মাটি ও মানুষের আবেগ আর লোকজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনে ঢাকায় আত্মপ্রকাশ করল নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আন্তরিক কুষ্টিয়া’।
মুহূর্তেই রাজধানী রূপ নিল কুষ্টিয়ার বাউল সুর, গ্রামীণ আবহ ও আন্তরিক মানুষের মিলনমেলায়, যেখানে ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও মানবিকতা হয়ে উঠল একমাত্র ভাষা।
বৃহস্পতিবার, ৮ জানুয়ারি ২০২৬, রাজধানীর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেগুনবাগিচাস্থ জাতীয় চিত্রশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় সংগঠনটির আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা সাড়ে ৫টায় অতিথি নিবন্ধনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় মূল আয়োজনে রূপ নেয় অনুষ্ঠানটি। আমন্ত্রিত অতিথি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও দর্শক-শ্রোতাদের উপস্থিতিতে মিলনায়তন পরিণত হয় এক আবেগঘন ও উৎসবমুখর মিলনস্থলে।
জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, “জাগো উজ্জ্বল পুণ্যে, জাগো নিশ্চল আশে”- এই স্লোগানকে সামনে রেখে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও লোকজ সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ, গবেষণা, চর্চা ও প্রচারের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই ‘আন্তরিক কুষ্টিয়া’র মূল প্রত্যয়। মানুষের যাপিত জীবনে ব্যবহারিক সংযোগ, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা এবং সংস্কৃতি-মননের মাধ্যমে সৃজনশীল কাজের সফল বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখাই সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য।
আন্তরিক কুষ্টিয়ার আত্মপ্রকাশ অনুষ্ঠানে দুটি ডকুমেন্টরি দেখানো হয়। যার একটি সুদূর আমেরিকা থেকে তৈরি করে পাঠিয়েছেন প্রবাসী সাংবাদিক আদিত্য শাহীন। যেখানে কুষ্টিয়ার ইতিহাস-ঐতিহ্য তুলে ধরা হয়। এ অনুষ্ঠানে বিগত বছরগুলোতে হারিয়ে যাওয়া আলোকিত মানুষদের স্মরণ করাসহ শ্রদ্ধা জানানো হয়।
সংগঠনের আহ্বায়ক সেলিম সরকার আবেগঘন ও হৃদয়ছোঁয়া বক্তব্যে বলেন, কুষ্টিয়ার মানুষদের এক সুতোয় গেঁথে গভীর আন্তরিকতায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে চান তাঁরা। ভালোবাসা, সহজ সম্পর্ক ও মানবিক বন্ধনের ভিত্তিতে একটি শক্ত সামাজিক কাঠামো গড়ে তোলাই তাঁদের স্বপ্ন। সংগঠনটির সদস্য সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন রজত হুদা।
আহ্বায়কের বক্তব্যের পর বাউল সম্রাট লালন ফকিরের গানে মিলনায়তন মাতিয়ে তোলেন প্রখ্যাত বাউল শিল্পী শফি মন্ডল। তাঁর কণ্ঠে লালনের গান ছড়িয়ে দেয় কুষ্টিয়ার মিষ্টি ভাষা ও ভাব। যা শ্রোতাদের বিমোহিত করে তোলে।
অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন আরমা গ্রুপের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক, নাট্যকার মাসুম রেজা, গীতিকবি মিল্টন খন্দকার, পরিচালক ও অভিনেতা সালাউদ্দিন লাভলু, কবি ও গবেষক বিলু কবির, কবি দীপু মাহমুদ, গানের ওস্তাদ মখলেসুর রহমান মিন্টু এবং শিল্পী শাওন আকন্দ। তাঁদের বক্তব্যে উঠে আসে কুষ্টিয়ার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মানবিক চেতনা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এর গুরুত্ব।
শিশু শিল্পী রুপাই মনিষ্যি হুদার নৃত্য পরিবেশনা অনুষ্ঠানে যোগ করে ভিন্নমাত্রার নান্দনিকতা ও প্রাণবন্ততা, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।
সাংগঠনিক দক্ষতা এবং আন্তরিক কুষ্টিয়ার জন্য ভূমিকা রাখায় এই অনুষ্ঠানে জনপ্রিয় ছড়াকার ও সাংবাদিক আতিক হেলাল, রফিক উল্যাহ, শফিকুল ইসলাম ও আসিফ রুপনকে বিশেষভাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। এসময় তারা অভিব্যক্তি প্রকাশসহ স্মৃতিচারণ করেন।
এই আয়োজনে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ- শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যকর্মী, শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। দীর্ঘদিন পর প্রিয় জেলার মানুষের সঙ্গে এক ছাদের নিচে মিলিত হওয়ার আনন্দে মিলনায়তনজুড়ে ছিল হাসি, গল্প আর আবেগের উচ্ছ্বাস।
অনুষ্ঠানের ফাঁকে ফাঁকে বাঙালি ঐতিহ্যবাহী খাবারের আয়োজন অংশগ্রহণকারীদের এনে দেয় বাড়ির স্বাদ ও শেকড়ের টান। দেশীয় খাবারের ঘ্রাণে রাজধানীর বুকে যেন ছড়িয়ে পড়ে কুষ্টিয়ার গ্রামবাংলার আবহ। সংস্কৃতি, মানুষের আন্তরিকতা ও বাঙালিয়ানা খাবারের এই সম্মিলন পুরো আয়োজনকে দেয় এক অনন্য মাত্রা।
কুষ্টিয়ার মাটির গন্ধ, মানুষের আন্তরিকতা আর লালনের মানবতার দর্শনকে এক মঞ্চে এনে ‘আন্তরিক কুষ্টিয়া’ প্রমাণ করল- সংস্কৃতি কেবল স্মৃতির বিষয় নয়, বরং মানুষের সঙ্গে মানুষের হৃদ্যতার এক জীবন্ত সেতু। রাজধানীর বুকে সেই সেতুরই নান্দনিক যাত্রা শুরু হলো নতুন প্রত্যয়ে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন চলচ্চিত্র নির্মাতা, নাট্যব্যক্তিত্ব আউয়াল রেজা এবং সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিলেন কবি, নাট্যকার ও পরিচালক আল মাসুম।
২৩৯ বার পড়া হয়েছে