সর্বশেষ

ফেবু লিখন

ফিরে পাওয়া শৈশব

হাবীব চৌহান
হাবীব চৌহান

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ ৯:৩৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
নৌকা নিয়ে শিশুদের দুরন্তপনার দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে নিজের শৈশবের উঠোনে ফিরে গিয়েছিলাম, টেরই পাইনি। চোখের সামনে তখন আর আব্দুল্লাহ, ছাবিব কিংবা হুসাইন নয়—দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদেরই ছোট্টবেলার মুখ। মনে হচ্ছিল, সময় যেন হঠাৎ পেছন দিকে হাঁটতে শুরু করেছে। নদীর জলে ভেসে উঠেছে হারিয়ে যাওয়া সেই দিনগুলো।
হাবীব চৌহান

আমাদেরও ছিল ছোট্ট একটি নৌকা। বর্ষা এলেই নৌকাটি হয়ে উঠত আমাদের আনন্দের বাহন। অবশ্য শুধু আনন্দের জন্য নয়, তখন নৌকা ছিল আমাদের জীবনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। চারদিকে পানি আর পানি। এপাড়া থেকে ওপাড়া, বাড়ি থেকে বাজার—কোথাও যেতে হলে নৌকাই ছিল ভরসা। আমাদের আশপাশের মানুষজন নৌকায় চড়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বেড়াতে যেতেন। দূর-দূরান্তের মানুষও নৌকায় চড়ে কুমারখালী শহরের দিকে আসতেন।

ছোটবেলায় দেখেছি, পাবনা থেকে মুদি দোকানের নানা মালামাল নৌকায় করে নিয়ে আসা হতো। দুর্গাপুর স্কুলের পাশেই নৌকা ভেড়ানো হতো। তারপর একে একে নৌকা থেকে মালামাল নামানো হতো। সেই দৃশ্যগুলো আজও যেন চোখের সামনে ভাসে। কত সহজ ছিল তখনকার জীবন! নদী ছিল পথ, নৌকা ছিল বাহন, আর বর্ষা ছিল উৎসবের মতো।

সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল পানির আসা-যাওয়ার সেই স্বাভাবিক ছন্দ। বর্ষায় পানি বাড়ত, আবার নদীতে পানি কমতে শুরু করলে আমাদের এলাকার পানিও ধীরে ধীরে নেমে যেত। জলাবদ্ধতা তখন আমাদের কাছে কোনো আতঙ্কের শব্দ ছিল না। আমরা পানির ওঠানামা দেখতাম, অনুভব করতাম। কখন পানি বাড়ছে, কখন কমছে—তারও যেন নিজস্ব এক ভাষা ছিল।

পানির সেই ওঠানামা বোঝার জন্য আমরা কাঠি পুঁতে রাখতাম। প্রতিদিন সেই কাঠির কাছে গিয়ে দেখতাম—পানি কতটা উঠল, কতটা নামল। পানির সঙ্গে আমাদেরও যেন এক অদ্ভুত বন্ধুত্ব ছিল। নদী-খাল, বিল-জলাশয় আর নৌকা মিলিয়ে আমাদের শৈশবের পৃথিবীটা ছিল অন্যরকম।

আজ সেই দিনগুলো কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

বর্ষা আসে, বৃষ্টি নামে; কিন্তু নদীর স্বাভাবিক জলধারা আর আগের মতো মানুষের জীবনকে ছুঁয়ে যায় না। বরং কোথাও কোথাও বর্ষা মানেই জলাবদ্ধতা, দুর্ভোগ আর পানিবন্দি জীবন। প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের যে সহজ সহাবস্থান ছিল, সময়ের স্রোতে তার অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তাই পুরোনো দিনের কথা মনে পড়লে মনে হয়—সেই দিনগুলোই বুঝি ভালো ছিল। একটু বেশি নির্মল, একটু বেশি আপন, আর অনেক বেশি জীবন্ত।

গত শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে গিয়েছিলাম এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে—পদ্মার শাখা কোল এলাকায়। সেখানে গিয়ে আবার যেন সেই পুরোনো দিনের মুখোমুখি হলাম।
কোলের বিস্তীর্ণ জলরাশিতে ছোট-বড় অসংখ্য নৌকা। কোথাও শ্রমিকেরা পাট ধোয়ার কাজে ব্যস্ত। কোথাও জেলেরা নৌকায় চড়ে মাছ ধরার ফাঁদ পেতে অপেক্ষা করছেন। আবার কোনো নৌকায় যাত্রী এপার থেকে ওপারে পাড়ি দিচ্ছেন। জল, নৌকা, মানুষ আর জীবিকার এই মেলবন্ধন দেখে মনে হচ্ছিল—নদী এখনো তার পুরোনো গল্পগুলো বুকে ধরে রেখেছে।

আমরা কোলের তীরে একটি নিরিবিলি জায়গায় বসে সেই দৃশ্য দেখছিলাম। চারপাশে এক ধরনের শান্ত সৌন্দর্য। পানির মৃদু ঢেউ, দূরে নৌকার চলাচল, মানুষের কর্মব্যস্ততা—সব মিলিয়ে মনটা কেমন প্রশান্ত হয়ে উঠেছিল।

এরই মধ্যে কোলের তীরে এসে হাজির হলো তিন শিশু—আব্দুল্লাহ, ছাবিব ও হুসাইন।

ওরা এসেই ডাঙায় তুলে রাখা একটি নৌকায় উঠে পড়ল। তারপর পানিতে ভেসে থাকা নৌকায় একে একে উঠে শুরু করল তাদের দুরন্তপনা। কে আগে যাবে, কে কীভাবে নৌকা চালাবে—এসব নিয়ে তাদের কী আনন্দ! পানির ওপর ছোট্ট নৌকা ছুটছে, আর তার সঙ্গে ছুটছে তিনটি শিশুমনের উচ্ছ্বাস।

আমি আর চমন ভাই চুপচাপ বসে দেখছিলাম সেই দৃশ্য।

কিন্তু সত্যি বলতে কী—আমরা আর সেখানে বসে ছিলাম না। মুহূর্তেই ফিরে গিয়েছিলাম বহু বছর আগের সেই শৈশবে। আব্দুল্লাহ, ছাবিব আর হুসাইনের জায়গায় যেন দেখতে পাচ্ছিলাম আমাদেরই মুখ। ছোট্ট ডিঙি নৌকায় চড়ে আমরাই যেন মহাআনন্দে মেতে উঠেছি। বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে আমাদের হাসি। নদীর বাতাস এসে এলোমেলো করে দিচ্ছে চুল। পৃথিবীতে তখন কোনো চিন্তা নেই, কোনো ব্যস্ততা নেই—আছে শুধু জল, নৌকা আর অফুরন্ত আনন্দ।

শৈশব বোধহয় এমনই।

সে চলে যায়, কিন্তু তার স্মৃতিগুলো কোথাও যায় না। কোনো এক বর্ষার দুপুরে, নদীর কোনো এক ঢেউয়ে, নৌকার দুলুনিতে কিংবা তিনটি শিশুর দুরন্ত হাসিতে হঠাৎ করেই সে ফিরে আসে।
একসময় শিশুরা নৌকা থেকে নেমে আমাদের কাছে এসে বসল। গল্প জমে উঠল। জানতে পারলাম, আব্দুল্লাহ তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছাবিব ও হুসাইন পড়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে। তাদের বাড়ি খোকসা উপজেলার গোপগ্রাম স্লুইসগেট এলাকায়।

ওদের সঙ্গে কথা বলতে বলতে মনে হলো—শৈশব আসলে কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু মানুষ বড় হয়ে যায়। সময় আমাদের দূরে নিয়ে যায়, জীবন আমাদের ব্যস্ত করে তোলে; কিন্তু মনের গভীরে ছোট্ট যে শিশুটি একদিন নৌকা নিয়ে নদীতে ছুটেছিল, সে ঠিকই থেকে যায়।

সেদিন কোলের তীরে বসে তাই শুধু তিন শিশুর নৌকা চালানো দেখিনি—দেখেছি নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে।

দেখেছি সেই পুরোনো বর্ষা, সেই বাড়তে থাকা পানি, কাঠি পুঁতে পানির ওঠানামা মাপার দিন, নৌকায় চড়ে এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ, পাবনা থেকে মালামাল নিয়ে আসা নৌকা, দুর্গাপুর স্কুলের পাশে নৌকা ভেড়ানোর দৃশ্য—আর দেখেছি এমন এক সময়, যখন পানি ছিল দুর্ভোগের নাম নয়; বরং ছিল জীবনেরই এক আনন্দময় অধ্যায়।

ফিরে আসার সময় মনে হচ্ছিল, নদীর জল যেন শুধু নৌকাগুলোকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়নি—আমাদেরও ভাসিয়ে নিয়ে গেছে বহু বছর আগের সেই নির্মল, নির্ভার, দুরন্ত শৈশবের কাছে।
কী আশ্চর্য—একটি ছোট্ট নৌকা কখনো কখনো শুধু নদী পার করে না; পার করে দেয় সময়ও।


লেখক: হাবীব চৌহান, সাংবাদিক।

(লেখাটি লেখকের ফেসবুক থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে)

১৪৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফেবু লিখন নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন