সর্বকনিষ্ঠ নারী এমপি নুসরাতের নতুন যাত্রা, দেশবাসীর কাছে দোয়া প্রার্থনা
বুধবার, ৬ মে, ২০২৬ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত বাগোয়ান গ্রামের তরুণী নুসরাত তাবাসসুম জ্যোতি মাত্র ২৬ বছর বয়সে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
ছাত্ররাজনীতি ও আন্দোলনের মাঠ থেকে উঠে আসা এই তরুণীর রাজনৈতিক অগ্রযাত্রা এখন দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
শিক্ষক পরিবারে জন্ম নেওয়া নুসরাতের শৈশব কেটেছে উপজেলার মথুরাপুর ইউনিয়নের বাগোয়ান গ্রামে। তিনি বাগোয়ান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা এবং বাগোয়ান কেসিভিএন মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে স্থানীয় ড. ফজলুল হক গার্লস ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে (২০১৮–১৯ সেশন) ভর্তি হন।
২০১৮ সালে ঢাকায় এসে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মাধ্যমে তার আন্দোলনমুখী জীবনের সূচনা ঘটে। এরপর তিনি বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের মাধ্যমে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। আবরার ফাহাদ হত্যার বিচারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে রাজপথে তার সক্রিয় উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
২০২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং ২০২৩ সালে ‘গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি’র প্রতিষ্ঠাকালীন যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন।
আন্দোলনের সময় নারীদের সংগঠিত করা, হামলার মুখে মানবঢাল হয়ে দাঁড়ানো এবং নির্যাতনের পরও পিছিয়ে না আসার কারণে তিনি ব্যাপক প্রশংসিত হন। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত জাতীয় নাগরিক কমিটির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশ নেন তিনি।
২০২৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আত্মপ্রকাশ করলে তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক হন। পরে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে গঠিত এনসিপির নারী শাখা ‘জাতীয় নারী শক্তি’র প্রধান সংগঠকের দায়িত্ব পান।
২০২৬ সালের এপ্রিলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পান নুসরাত। নির্ধারিত সময়ের ১৯ মিনিট পরে মনোনয়ন জমা দেওয়ায় নির্বাচন কমিশন প্রথমে তার প্রার্থিতা বাতিল করে। পরে হাইকোর্টে রিট আবেদনের পর আদালতের নির্দেশে তার মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়।
সর্বশেষ ৫ মে নির্বাচন কমিশন তাকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত ঘোষণা করে গেজেট প্রকাশ করে। এরপর ৬ মে দুপুরে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকারের কার্যালয়ে শপথ গ্রহণ করেন।
এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর নুসরাত তাবাসসুম গণমাধ্যমে বলেন, “সর্বকনিষ্ঠ নারী সংসদ সদস্য হিসেবে কিছুটা নার্ভাস লাগছে। বোর্ড পরীক্ষার মতো অনুভূতি হচ্ছে। মনে হচ্ছে বড় একটি দায়িত্ব কাঁধে এসেছে। দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই, যেন দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে পারি।”
নুসরাতের নানি আছিয়া বেগম পারুল বলেন, “আমার নাতনি এমপি হয়েছে—এতে আমরা খুব খুশি। আমি দোয়া করি, সে যেন তার দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারে।”
তার নানা আব্দুল জলিল বলেন, “নুসরাত ছোটবেলা থেকেই প্রতিবাদী ছিল। আন্দোলনের সময় তাকে ডিবি অফিসে নেওয়ার ঘটনায় আমরা খুব চিন্তিত ছিলাম। এখন সে দেশের মানুষের জন্য কাজ করবে—এটাই আমাদের আশা।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী শামিম রেজা বলেন, “নুসরাত আমাদের এলাকার গর্ব। আমরা চাই, সে সাধারণ মানুষের পাশে থেকে উন্নয়নে কাজ করুক।”
নুসরাতের শিক্ষক এবং কেসিভিএন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মাসুদ রানা বলেন, “ছোটবেলা থেকেই সে মেধাবী ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয় ছিল। তার এই অর্জনে আমরা গর্বিত।”
ছাত্র আন্দোলনের রাজপথ থেকে জাতীয় সংসদ পর্যন্ত নুসরাত তাবাসসুমের এই যাত্রা নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার গল্প হয়ে উঠেছে। এখন দেখার বিষয়, তরুণ এই সংসদ সদস্য কতটা সফলভাবে তার দায়িত্ব পালন করতে পারেন।
১৪৯ বার পড়া হয়েছে