উড়ো খবর, জ্বালানি সংকট ও সরকারের পরীক্ষা
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬ ৫:৩৬ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত বেড়েই চলেছে। আপাতত থামছে না যুদ্ধের দামামা। যার বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।
অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি সংকটের প্রভাব স্পষ্ট। উড়ো খবরে টালমাটাল দেশের জ্বালানি খাত। কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি হওয়া সংকটে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। দুর্ভোগ বাড়ছে জনজীবনে। হঠাৎ করে জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়ায় পরিবহন, কৃষিকাজ ও দৈনন্দিন জীবনে বহুমুখি সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
গণমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, রাজধানীর বেশিরভাগ ছোট পাম্প বন্ধ। বড় পাম্পে প্রচণ্ড ভিড়। অনেক পাম্পের আশপাশে লাইন ছাড়িয়ে গেছে এক কিলোমিটারের বেশি। এই ভোগান্তিতে বেশি পড়তে হচ্ছে বাইকারদের। কখনো কখনো দুই লিটার তেল কিনতে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে আড়াই ঘণ্টা!
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সুযোগের সন্ধানে থাকা অসাধু ব্যবসায়ীরা জ্বালানি মজুত করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছেন। তারা পরিকল্পিতভাবে খুচরা দোকানও বন্ধ রেখে সরবরাহে বাধা দিচ্ছেন। এর সুযোগে জ্বালানির দাম বাড়িয়ে বাড়তি মূল্যে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে ন্যায্যমূল্যে জ্বালানি কিনতে পারছেন না ক্রেতারা।
তারা আরো অভিযোগ, সরকার বলছে তেলের কোনো সংকট নেই। তাহলে তেল ক্রয়ে লিমিট কেন? ক্রয়সীমা নির্ধারণ করায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। এই আতঙ্কে অনেকে মজুত করছেন। তাইতো পাম্পে-ডিপোতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাইক ও প্রাইভেটকারের লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছে। সবখানেই অসহনীয় ভোগান্তির চিত্র।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম বাড়তে পারে, এই আলোচনা শুরু হতে না হতেই ফিলিং স্টেশনে তেলের সংকট কিভাবে হয়? সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত কড়া ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। নাহলে পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। যার খেসারত দিতে হবে এই সরকারকে।
ফিলিং স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দাম বাড়তে পারে বা সংকট হতে পারে- এমন শঙ্কা থেকে আগেভাগেই বেশি করে জ্বালানি তেল কিনছেন অনেকে, যার ফলে সংকট তৈরি হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে গ্রাহকদের পক্ষ থেকে ফিলিং স্টেশন বা ডিপোগুলো তেলের কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশে জ্বালানি নিয়ে এক ধরনের 'অস্থিরতা' তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।
রাজধানী ঢাকার মতো বন্দরনগরী চট্টগ্রামেও একই পরিস্থিতি। পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ লাইন। বিড়ম্বনার যেন শেষ নেই বাইকারসহ সংশ্লিষ্টদের। পাম্পের কর্মচারীদেরও তেল সরবরাহ করতে করতে নাজেহাল অবস্থা! বর্তমানে ফিলিং স্টেশনগুলোতে ডিজেল লিটারপ্রতি ১০০ টাকা, কেরোসিন ১১২ টাকা, অকটেন ১২০ টাকা এবং পেট্রোল ১১৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড ও পদ্মা অয়েল থেকে বলা হচ্ছে, জ্বালানি তেলের সংকট নেই। দেশে জ্বালানির পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে।
পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী তারা কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বর্তমানে জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। তবে অযথা বেশি তেল কিনে কৃত্রিম সংকট তৈরি না করতে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।
বিপিসির কর্মকর্তারা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাবে অনেকেই ভাবছেন এখনই তেলের সংকট হবে। আসলে এখনই তেলের সংকট হবে না। যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে আগামী মাসে সংকট হতে পারে। এখন ক্রেতারা যেভাবে কিনছেন, এটি প্যানিক বায়িং। কারণ, বর্তমানে যে পরিমাণ মজুত রয়েছে, তাতে ডিজেল ১৪ দিন, অকটেন ২৮ দিন, পেট্রোল ১৫ দিন, ফার্নেস ৯৩ দিন ও জেট ফুয়েল ৫৫ দিন চলবে।
এদিকে, জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই বলে শনিবার (৭ মার্চ) আশ্বস্ত করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। আগামী ৯ তারিখ আরও ২টি ভেসেল আসছে জানিয়ে তিনি বলেন, সারাদেশে ভ্রাম্যমাণ মোবাইল কোর্ট কাজ শুরু করছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে যে পেনিক কাজ করছে যার কোনো যুক্তি নেই। তেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা করছে সরকার।
এরমধ্যে সরকার কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। দেশে সরকারিভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ে বৈদ্যুতিক বাতি, এসি ব্যবহার কমিয়ে আনা, আলোকসজ্জা পরিহারসহ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে গ্যাস সাশ্রয়ের লক্ষ্যে আটটি সার কারখানার পাঁচটি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। দেশে গ্যাসের ৬০ শতাংশের বেশি ব্যবহার হয় বিদ্যুৎ ও সার কারখানায়। জাতীয় গ্রিডে এলএনজির সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে পেট্রোবাংলা। বিদ্যুৎ কেন্দ্রেও গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা কমানো হয়েছে। মূলত, জ্বালানি আমদানিতে সংকট তৈরি হওয়ায় জ্বালানি পণ্যে রেশনিং করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারের উচিত জ্বালানি তেলের সরবরাহ, ডিস্ট্রিবিউশন ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। মজুতদারি ও চোরাচালান ঠেকাতে নজরদারি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি ব্যক্তিগত যানবাহন ব্যবহার না করে গণপরিবহন ব্যবহার করতে হবে। সব সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও দেশের সকল সচেতন নাগরিককে জ্বালানি সাশ্রয়মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। রান্না ও অন্যান্য কাজে গ্যাস ব্যবহারে সর্বোচ্চ সাশ্রয়ের জন্য উপযুক্ত পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে। অবৈধভাবে গ্যাস ব্যবহার থেকে সবাইকে বিরত থাকতে হবে। নাহলে ভোগান্তির কোন সীমা থাকবে না সাধারণ মানুষের।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক।
১০৫ বার পড়া হয়েছে