ইরান–ইসরাইল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ
শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬ ৪:৫৫ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্ব অর্থনীতি আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি আন্তঃনির্ভরশীল। একটি অঞ্চলের রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত দ্রুত অন্য অঞ্চলের অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক ইরান–ইসরাইল সংঘাতও এমনই একটি ঘটনা, যার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্ব অর্থনীতিতে।
যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার ক্ষেত্রে ইতিহাস দেখায় যে প্রথম ধাক্কাটি সাধারণত পড়ে জ্বালানি বাজারে। তেলের দাম বাড়ে, সরবরাহ শৃঙ্খলে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তার ঢেউ এসে লাগে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলোর ওপর। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। বরং জ্বালানি আমদানির ওপর উচ্চ নির্ভরতার কারণে এই ধরনের সংঘাত বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতিকে বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জ্বালানি কাঠামোর একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, দেশটি তার জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করে। বিশেষ করে অপরিশোধিত তেল, পরিশোধিত জ্বালানি ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে। অনুমান করা হয়, বাংলাদেশের প্রাথমিক জ্বালানি আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসে এবং এসব সরবরাহের বড় অংশই পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। এই সমুদ্রপথগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো হরমুজ প্রণালী, যার মধ্য দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ LNG পরিবাহিত হয়।
যদি ইরান–ইসরাইল সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করে, তবে তা বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহকে বড় ধরনের ধাক্কা দিতে পারে। আর তার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর অর্থনীতিতে।
প্রথমত, তেলের আন্তর্জাতিক দাম বাড়লে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে জ্বালানি আমদানির জন্য। যদি বৈশ্বিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়, তাহলে দেশের আমদানি বিল বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হবে। অর্থনীতিবিদরা ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছেন যে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বাণিজ্য ঘাটতি ও চলতি হিসাবের ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জ্বালানির দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পায়। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প কারখানা, পরিবহন ও কৃষি সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি একটি মৌলিক উপাদান। ফলে জ্বালানির দাম বাড়লে শিল্প উৎপাদনের খরচও বাড়ে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্প, যা বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস, তা জ্বালানি ব্যয়ের ওপর উল্লেখযোগ্যভাবে নির্ভরশীল। যদি বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বৃদ্ধি পায়, তবে শিল্পখাতে উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান দুর্বল হতে পারে।
তৃতীয়ত, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব পড়ে মূল্যস্ফীতির ওপর। তেলের দাম সাধারণত বিশ্ববাজারে অন্যান্য পণ্যের দামের একটি সূচক হিসেবে কাজ করে। যখন জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায় এবং এর ফলে খাদ্যসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দামও বাড়তে শুরু করে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে এটি বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্যের বাজারে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, এই সংঘাত আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায়ও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা প্রায়ই আন্তর্জাতিক শিপিং রুটে ঝুঁকি বাড়ায় এবং যুদ্ধজনিত বীমা খরচ বৃদ্ধি করে। এর ফলে আমদানি ও রপ্তানি উভয় ক্ষেত্রেই পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। যদি এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্য—বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকামুখী পোশাক রপ্তানি—বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক জটিলতার মুখে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু তেলের বাজার নয়, গ্যাস বাজারেও অস্থিরতা তৈরি করছে। যুদ্ধজনিত কারণে কিছু ক্ষেত্রে LNG সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে এবং স্পট মার্কেটে গ্যাসের দাম দ্রুত বাড়ছে। ফলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বেশি দামে জ্বালানি কিনতে হচ্ছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কার্যক্রমের ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
তবে এটাও সত্য যে বাংলাদেশ কিছু স্বল্পমেয়াদি প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। জ্বালানি সংস্থাগুলো সাধারণত এক মাসের মতো কৌশলগত মজুত ধরে রাখে এবং বিকল্প আমদানি রুট ব্যবহার করার পরিকল্পনাও রয়েছে। কিন্তু এগুলো মূলত স্বল্পমেয়াদি সমাধান। যদি সংঘাত দীর্ঘমেয়াদি হয় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকে, তাহলে সেই ধাক্কা সামলানো বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
এই বাস্তবতা আমাদের সামনে একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন তুলে ধরে—বাংলাদেশ কতদিন পর্যন্ত আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামোর ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পারবে? বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে যে বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিকে বারবার ঝুঁকির মধ্যে ফেলতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে দীর্ঘমেয়াদে কয়েকটি কৌশলগত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভর না করে অন্যান্য অঞ্চল থেকেও জ্বালানি আমদানির সুযোগ তৈরি করা দরকার। দ্বিতীয়ত, নবায়নযোগ্য জ্বালানি—যেমন সৌর ও বায়ু শক্তি—উন্নয়নে আরও বেশি বিনিয়োগ করা উচিত। তৃতীয়ত, জ্বালানি দক্ষতা বাড়াতে শিল্প ও পরিবহন খাতে প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, ইরান–ইসরাইল সংঘাত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে বৈশ্বিক অর্থনীতি কতটা আন্তঃনির্ভরশীল। মধ্যপ্রাচ্যের একটি সামরিক উত্তেজনা হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের একটি দেশের অর্থনীতিকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এখনই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। কারণ, ভবিষ্যতের বিশ্বে শুধু অর্থনৈতিক নীতি নয়, ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও একটি দেশের উন্নয়নের পথ নির্ধারণ করবে।
লেখক: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।
১৫০ বার পড়া হয়েছে