অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে অচল চট্টগ্রাম বন্দর, ভয়াবহ ক্ষতির মুখে অর্থনীতি
বৃহস্পতিবার , ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ২:২৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
শ্রমিক-কর্মচারীদের ডাকা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দর। গত দুই দিন ধরে বন্দর থেকে একটি কনটেইনারও খালাস হয়নি। জাহাজে কনটেইনার ওঠানামার কার্যক্রমও সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। ফলে বন্দর জেটিতে ভিড়ছে না নতুন জাহাজ, আটকে আছে শতাধিক পণ্যবাহী জাহাজ।
স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন যেখানে প্রায় পাঁচ হাজার কনটেইনার খালাস হয় এবং গড়ে আট হাজার কনটেইনার জাহাজ থেকে ওঠানামা করে, সেখানে বর্তমানে সব কার্যক্রম স্থবির। বন্দরের ১২টি গেট দিয়ে প্রতিদিন গড়ে আট হাজার যানবাহন প্রবেশ করলেও এখন পুরো এলাকা নীরব।
শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুল আলম জুয়েল বলেন, গত ১৯ বছরে চট্টগ্রাম বন্দর এক দিনের জন্যও বন্ধ হয়নি। নির্বাচন ও রমজানের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়ের আগে এমন কর্মবিরতি নজিরবিহীন।
ব্যবসায়ী ও বন্দর ব্যবহারকারীদের দাবি, টানা কর্মবিরতিতে প্রতিদিন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতি হচ্ছে হাজার কোটি টাকার বেশি। বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি ও এশিয়ান অ্যাপারেলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ সালাম বলেন, পাঁচ দিন ধরে চলমান অচলাবস্থা ইতোমধ্যে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। রপ্তানি পণ্য সময়মতো ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে না পারলে দেশের ভাবমূর্তি ও ভবিষ্যৎ অর্ডার ঝুঁকিতে পড়বে।
আমদানি-রপ্তানিকারকরা জানান, দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে বন্দরনির্ভর ২০টিরও বেশি খাত অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়বে। বন্দর, কাস্টমস, ডিপো, শিপিং এজেন্ট, ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার, সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, পোশাক শিল্প ও পরিবহন খাত—সবখানেই নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বন্দরের প্রধান তিন টার্মিনাল—জিসিবি, সিসিটি ও এনসিটিতে সব কার্যক্রম বন্ধ থাকায় নতুন জাহাজ নোঙর করতে পারছে না। ইতোমধ্যে ১১টি জাহাজ দুই দিন ধরে জেটিতে আটকে আছে। পাইলটরা কাজে যোগ না দেওয়ায় বন্দর চ্যানেল দিয়ে জাহাজ চলাচলও বন্ধ রয়েছে। সীমিত আকারে কেবল আরএসজিটি টার্মিনালে কার্যক্রম চলছে, যা মোট কনটেইনারের মাত্র ৩ শতাংশ হ্যান্ডল করে।
কর্মবিরতির কারণে ডিপো ও বন্দরে কনটেইনারের জট বাড়ছে। ৩০ জানুয়ারি বন্দরের জেটিতে কনটেইনার ছিল ৩৫ হাজারের কিছু বেশি, যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজারে। ডিপোগুলোতেও রপ্তানি কনটেইনার জমে গেছে।
স্বাভাবিক সময়ে যেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২ হাজার ৮০০ রপ্তানি কনটেইনার ডিপো থেকে বন্দরে যায়, সেখানে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির প্রথম দিনে গেছে মাত্র ২০৫টি। আমদানি কনটেইনার ডিপোতে আসা কমে দাঁড়িয়েছে ৭০ টিইইউতে। এ হিসাবে আমদানি ও রপ্তানি কনটেইনার চলাচল কমেছে গড়ে ৯৩ থেকে ৯৫ শতাংশ।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছাড়া ডিপোতে পণ্য শুল্কায়ন সম্ভব নয়। কর্মবিরতির ফলে সেই কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শ্রমিক-কর্মচারীরা বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি টার্মিনাল ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করছেন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির বলেন, উচ্চ আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে চুক্তির প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। দাবি আদায় না হলে কর্মসূচি আরও কঠোর করা হবে।
অচলাবস্থা নিরসনে ব্যবসায়ীরা আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে আন্দোলনকারীরা ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত ও গণবদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবি জানান। ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস দেন এবং কর্মবিরতি প্রত্যাহারের অনুরোধ জানান।
এম এ সালাম বলেন, সামনে নির্বাচন, রমজান ও সীমিত কর্মদিবস—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটজনক। আলোচনার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। সমঝোতার কোনো বিকল্প নেই।
এদিকে বন্দর পরিস্থিতি নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকালে বন্দর ভবনে সব পক্ষকে নিয়ে বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকে নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন উপস্থিত থাকবেন।
১৩৫ বার পড়া হয়েছে