ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে আদালতের নির্দেশ
সোমবার, ১৮ মে, ২০২৬ ৬:৩৭ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
বরিশাল নগরীর আলোচিত ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে একটি মিস কেস (নং-০২/২০২৬) দায়েরের পর স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেন বরিশালের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম শরিয়ত উল্লাহ।
১৭ মে বিচারকের স্বাক্ষরিত আদেশের অনুলিপি গণমাধ্যমের হাতে পৌঁছেছে। এতে বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার নিচে নন—এমন একজন কর্মকর্তার মাধ্যমে অভিযোগগুলো তদন্ত করে আগামী ১৫ জুনের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।
আদালতের আদেশে বলা হয়েছে, ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজ কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট কেউ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ আদায় করেছে কি-না, করে থাকলে তা আর্থিক বিধি অনুসরণ করে নেওয়া হয়েছে নাকি বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে—এসব বিষয় তদন্ত করতে হবে। একই সঙ্গে কতজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে মোট কত টাকা নেওয়া হয়েছে, কারা এই অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কি-না, তাও খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে।
আদেশে উল্লেখ করা হয়, বরিশাল মহানগরীর কোতোয়ালি মডেল থানার সিএন্ডবি রোড এলাকায় অবস্থিত ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সময় টিভিতে প্রচারিত হয়েছে। এসব সংবাদ আদালতের নজরে এলে বিচারক বিষয়টি আমলে নেন।
গত ১১ মে সময় টিভিতে প্রচারিত “বরিশালে নার্সিং প্রশিক্ষণের নামে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ” শিরোনামের প্রতিবেদনের সারাংশও আদালতের নথিতে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, কলেজটির বিএসসি নার্সিং কোর্সের প্রায় ২০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে সরকারি হাসপাতালে প্রশিক্ষণের কথা বলে জনপ্রতি ১০ হাজার টাকা করে প্রায় ২৭ লাখ টাকা আদায় করা হয়। পরে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রকাশ্যে এলে শিক্ষার্থীরা টাকা ফেরতের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল, শিক্ষকদের অবরুদ্ধকরণ এবং অনশন কর্মসূচি পালন করেন। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও তারা টাকা ফেরত পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ঘটনায় উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও উঠে এসেছে। ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের চেয়ারম্যান মো. জহিরুল ইসলাম দাবি করেছেন, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থ শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, সরকারি হাসপাতালে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের প্রশিক্ষণের নামে এভাবে অর্থ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান নেই।
অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, নিয়ম অনুযায়ী নিজস্ব ক্যাম্পাস বা ভবন থাকার কথা থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির তা নেই। চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলাম অতীতে আওয়ামী লীগের এবং বর্তমানে ক্ষমতাসীন দলের নাম ব্যবহার করে বরিশাল, পটুয়াখালী ও মাদারীপুরে কাগজে-কলমে ১৫টির বেশি কলেজ পরিচালনার দাবি করলেও বাস্তবে সেসব প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এমনকি সরকারি তদন্ত দল পরিদর্শনে গেলে একই প্রতিষ্ঠানে ভিন্ন ভিন্ন সাইনবোর্ড টানিয়ে দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া চেয়ারম্যান জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি ও নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগে আগেও আদালতে একাধিক মামলা দায়ের হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালত তার পর্যবেক্ষণে বলেন, প্রকাশিত সংবাদ সঠিক হয়ে থাকলে তা দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৪০৬ ও ৪২০ ধারা, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ অনুযায়ী গুরুতর শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
আদালত আরও উল্লেখ করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আস্থা, বিশ্বাস ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নষ্ট করছে এবং সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। জনস্বার্থ ও ন্যায়বিচারের স্বার্থে আদালত বিস্তারিত অনুসন্ধানের নির্দেশ দিয়েছেন।
অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তাকে সরেজমিন পরিদর্শন, খসড়া মানচিত্র প্রস্তুত এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।
আদালতের এই আদেশের অনুলিপি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, মহানগর দায়রা জজ, চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, জেলা প্রশাসক এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে আদালতের এ নির্দেশে ডিডাব্লিউএফ নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তাদের আশা, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১২১ বার পড়া হয়েছে