পারিবারিক কবরস্থানে বৃষ্টির দাফন, মরণোত্তর ডক্টরেট দেবে ভার্সিটি
শনিবার, ৯ মে, ২০২৬ ২:০২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিহত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি (২৬)-এর মরদেহ দেশে পৌঁছানোর পর মাদারীপুরের সদর উপজেলার খোয়াজপুর ইউনিয়নের চর গোবিন্দপুর গ্রামে নেমে আসে শোকের ছায়া।
শেষবারের মতো একনজর দেখতে সকাল থেকেই তার পৈতৃক বাড়িতে ভিড় করেন স্বজন, বন্ধু ও এলাকাবাসী। মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরো এলাকায় এক হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে চারপাশের পরিবেশ। দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বৃষ্টিকে শেষ বিদায় জানাতে তার বাড়িতে ভিড় করেন। পরে বাদ আসর জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে, দাদির পাশেই তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। স্বজন ও এলাকাবাসী এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার (৯ মে) সকাল ৮টা ৪০ মিনিটের দিকে বৃষ্টির মরদেহ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষে দুপুরের দিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছালে শোকের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে ওঠে। এরপর বাদ আসর জানাজা শেষে তাকে দাফন করা হয়।
নিহতের চাচি জাকিয়া সুলতানা বলেন, বৃষ্টি ছিল এলাকার “শিক্ষার আলো”। তার মৃত্যুতে সেই আলো নিভে গেছে। তার কাছ থেকে পরিবারের শিশুরাও অনেক কিছু শিখেছে। এমন মেধাবী আর কেউ এ এলাকায় হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি।
চাচা দানিয়াল আকন বলেন, বৃষ্টি সবসময় সবাইকে ভালোভাবে পড়াশোনার পরামর্শ দিত। তিনি বলেন, “আমরা শুধু একজন মেয়েকে হারাইনি, পুরো এলাকা একটি আলোকিত মানুষকে হারিয়েছে।” তিনি হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।
চাচাতো ভাই রুমান আকন জানান, বৃষ্টির কাছ থেকেই তিনি ভালো ফল করার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। তার দেখানো পথেই তিনি ক্লাসে প্রথম স্থান অর্জন করেন বলে জানান তিনি। এখন আর কেউ তাকে সেই উপদেশ দেবে না—এ কথা বলতে গিয়ে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
মেয়েকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন বাবা জহির আকন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “আমার মেয়ের কী অপরাধ ছিল, কেন তাকে হত্যা করা হলো?” তিনি হত্যাকারীদের দ্রুত ও কঠোর শাস্তির দাবি জানান।
পরিবার সূত্রে জানা যায়, নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক সম্পন্ন করেন। পরে তিনি রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তরে ভর্তি হন।
স্নাতকোত্তর শেষ করার আগেই তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ফুল স্কলারশিপে পিএইচডি করার সুযোগ পান। ২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট তিনি বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যান।
গত ১৭ এপ্রিল ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডার দুই শিক্ষার্থী—বৃষ্টি ও জামিল আহমেদ লিমন—নিখোঁজ হন। লিমন ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। ৪ মে লিমনের মরদেহ দেশে পৌঁছায়। এ ঘটনায় লিমনের রুমমেট হিশাম আবুঘরবেহকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ২৬ বছর বয়সী ওই মার্কিন তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী।
এদিকে, নিহত বৃষ্টি ও লিমনকে মরণোত্তর ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা কর্তৃপক্ষ। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম টাম্পা বে ২৮-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ৮ মে স্থানীয় সময় শুক্রবার (বাংলাদেশ সময় পরদিন শনিবার) বিশ্ববিদ্যালয়ের বসন্তকালীন সমাবর্তনে তাদের এই ডিগ্রি প্রদান করা হবে।
বৃষ্টির মৃত্যুতে তার গ্রাম চর গোবিন্দপুরসহ পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। এলাকাবাসী ও স্বজনরা এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।
১০৫ বার পড়া হয়েছে